প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৫ ২২:৫৭
জুলাই বিপ্লবে ছাত্র—জনতার পক্ষে প্রবাস থেকে যুক্ত হন রেমিট্যান্স যোদ্ধারাও। রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধসহ প্রবাসের রাজপথে প্রতিবাদী মিছিলও করেছেন অনেকে। অন্যান্য দেশের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মিছিল হয়, তবে ওই দেশে আন্দোলন নিষিদ্ধ থাকায় ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছিলো অনেক বাঙালি শ্রমিককে। ওখানকার সরকার কাউকে দশ বছর, কেউ ২৪, আবার কাউকে কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডেও দণ্ডিত করার নির্দেশ দেয়। এই খবর দেশে পেঁৗছালে উৎকষ্ঠায় পড়ে পরিবার ও স্বজনরা।
সংসারের ঘানি টানতে বিদেশে শ্রম বিক্রয় করতে যাওয়া এই মানুষগুলো বিপদে পড়ায় দেশে থাকা পরিবারের স্বজনদের হৃদয়—বিদারক আহাজারি ছিল দেশের বিভিন্ন এলাকায়। একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। আরব আমিরাতের বিপদে পড়া মানুষগুলোর স্বজনদেরও স্বপ্ন দেখার সাহস বাড়ে। তারা ছুেঁট যান অন্ত:বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে। প্রধান উপদেষ্টার চেষ্টায় দেশে ফিরেন অনেকে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ মুক্তি পাওয়া সুনামগঞ্জের এক তরুণের নাম আলী আহমদ দুলাল। যিনি চার মাস কারাবরণ করে রাষ্ট্রীয় তৎপরতায় দেশে এসেছিলেন। জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার নোয়াখালি বাজারের পাশেই আলী আহমদ দুলালের বাড়ি। মঙ্গলবার বিকেলে আলী আহমদ দুলালের বাড়িতে গেলে, নিজের কষ্টের নানা স্মৃতিকথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, পাঁচ আগস্ট আমি বাড়ি ফিরে আসার জন্য টিকিট করেছিলাম। আমাকে ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে দেয়। তারপর একদল মুখোশধারী লোক এসে আমার চোখ কালো কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তুলে নিয়ে যায়। এদিন থেকে আড়াই মাস আমি দিনের আলো দেখি নি। মাটির নিচে, না উপরে আছি, সেটাও জানতাম না। শুধু আমি না, আমার সঙ্গের ১৮৯ জনের একই অবস্থা ছিল। আবুধাবির কারাগারে দিন কাটাতে হয়েছে আমাদের। সবাই জানে ৫৭ জনের কথা। প্রথম দিকে ৫৭ জনের রায় হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ পৃথিবীর মানবিক প্রতিবাদী মানুষরা এ ঘটনার নিন্দা জানান। এই অবস্থায় বাকীদের তথ্য গোপন রাখে আবুধাবি সরকার।
তিনি বলেন, একদিন একজন পুলিশ এসে আমাদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে ভালো আরবি জানো। কুমিল্লার একজন বয়স্ক লোক হাত তুলেন। তারা তাকে বলে দিলো, এদের বুঝিয়ে বল কালেমা পড়ে নিতে। কোনো চিৎকার চেঁচামেচি না করতে। যে কোনো মুহুর্তে তাদেরকে ব্রাশ ফায়ার করা হবে। এই কথা শুনে ওই বয়স্ক লোকটি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। আমরা তখন বেঁচেও যেনো বেঁচে নেই। সবাই কান্নাকাটি করতে লাগলো। আমার দুইটি বাচ্চার কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। কেউ মা—বাবা, কেউ আবার সন্তানের কথা মনে করে কাঁদতে শুরু করলো। এভাবে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমরা বন্দি ছিলাম প্রায় আড়াই মাস। আড়াই মাস পর আমাদের আদালতে তোলা হয়। আন্দোলনে যারা নামমাত্র অংশ নিয়েছে, তাদের ১০ বছর, আর যারা নেতৃত্ব বা শ্লোগান দিয়েছে তাদের যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছিলো আবুধাবির সরকার। আমার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিলো। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসে আমাদেরকে ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এখনো ২৬ জন জুলাই যোদ্ধা প্রবাসের কারাগারে আছেন।
জুলাই স্মরণ নিয়ে কথা বলতেই চোখ ছলছল করে পানি ঝড়তে থাকলো দুলালের। তিনি জানালেন, দেশে ফিরে আসতে পারবেন বলে ভাবেন নি কখনও। আড়াই মাস পর যখন দিনের আলোতে ফিরে আসেন, তখন বুঝতে পারেন বেঁচে আছেন।
তিনি জানালেন, তাদের রাখা হয়েছিলো অন্ধকার এক ঘরে। তিন চার দিনের মাথায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়।
আন্দোলনে জড়ানোর স্মৃতিচারণ করলেন এই জুলাই যোদ্ধা বললেন, আমরা যারা বিদেশে থাকি বা থাকতাম তারা সব সময় দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবর দেখার জন্য উদগ্রিব ছিলাম। ভালো ভালো গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ দেখার জন্য কাজ—কর্ম ছেড়ে বসে থাকতাম। বেশিরভাগ প্রবাসীরাই দেশের ছোটখাটো সংবাদও মিস করেন নি। আমরা সব কিছু জানতাম। কখন কী ঘটছে, না ঘটছে তা লক্ষ্য রাখতাম। এক সময় দেখলাম যে সরকার কোনো সংবাদ প্রচার করতে দিচ্ছে না। ইন্টারনেট বন্ধ করে রেখেছে। পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে ছাত্রদের হত্যা করতে শুরু করলো। আন্দোলনে জমায়েত বাড়তে থাকলো। ছাত্ররা প্রবাসীদের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান করলো। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সারা পৃথিবীর বাংলাদেশি প্রবাসীরা রেমিটেন্স দেওয়া বন্ধ করে দিলো। সরকারের ভীত কেঁপে উঠলো। ১৯ জুলাই আমরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। আবুধাবির ক্যাপিট্যাল সিটি বাংলায় এটাকে খেজুরতলা বা বাংলাবাজার বলে। এখানেই আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আমরা প্রায় ৩—৪শ’ মানুষ ছিলো মিছিলে। প্রতিটি মানুষের মনে ক্ষোভ ছিলো, কাউকে দাওয়াত করে আন্দোলনে আনতে হয় নি।
তিনি বলেন, আমাদের খোঁজ খবর এখন আর কেউ রাখে না। রাষ্ট্রও খোঁজ নিচ্ছে না। প্রবাস জীবনও অনিশ্চিত। আমাদেরকে আড়ালে রাখা হয়েছে। যখন আমি নিখেঁাজ ছিলাম আমার স্ত্রী তখন সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশ এম্বেসি, উপদেষ্টার কার্যালয় সব জায়গায় ঘুরেছেন। আমার পরিবার কী অবস্থায় ছিলো— তা একমাত্র আল্লাহ্ই ভালো জানেন। এখন আমি নিঃস্ব। প্রবাসে গিয়েছিলাম একটি ঘর করার আশায়। পারি নি। জায়গা আছে। একটি জীর্ণ ঘরে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় পাশেই এক আত্মীয়ের ঘরে থাকছি। আমার সব কিছু শেষ। সরকারিভাবে এখনো কোনো স্বীকৃতি পাইনি। আমাদের ত্যাগও তো কম ছিলো না। জীবনের নিশ্চয়তার কথা চিন্তা না করে নতুন বাংলাদেশ আর স্বৈরাচার পতনের জন্য মাঠে নেমেছিলাম। এখন আমাদের খবর আর কেউ রাখে না। আমার সাথী ২৬ জন এখনো বন্দি। তাদেরও বের করে আনা হচ্ছে না। তাদেরকে বের করে আনা হোক এই দাবি জানাচ্ছি। আমরা চাই নতুন বাংলাদেশে প্রবাসি এই জুলাই যোদ্ধারা যেন বেকার না থাকে, ভাতে কষ্ট না পায়। আমি শান্তিগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছুটা আশ^স্ত হয়েছি, তিনি পাশে দাঁড়ানোর আশ^াস দিয়েছেন। ভেঙে না পড়ার সাহস দিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিক।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বললেন, আলী আহমদ দুলালের বিষয়ে আমি কাজ করার চেষ্টা করছি। বিভিন্নভাবে আমরা তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করছি। ইদানিং উপজেলা পরিষদের সামনে একটি সেড হচ্ছে। সেখানে তাকে একটি ক্যান্টিন করার সুযোগ দেবার চিন্তা করা হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন