প্রকাশিত: ১১ জুলাই, ২০২৫ ০০:১০
এক যুগ আগে জামাইয়ের কাছে বিক্রি করা জায়গা দখল করতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। হামলা করতে শিশু—কিশোরদের নিয়ে করা হচ্ছে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া, শেখানো হচ্ছে কৌশল। সেই দৃশ্য আবার ধারণ করে পাঠানো হচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন জনের মোবাইলে মোবাইলে। আগুন দিয়ে পুড়ানো হয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের ঘর, কেটে ফেলেছে গাছ। শ্বশুরগোষ্ঠীর আতঙ্কে বাড়িছাড়া জামাই, অসহায় দিন কাটছে পরিবারের। অভিযান চালালেও অস্ত্র উদ্ধার কিংবা আসামী গ্রেফতার কিছুই করতে পারেনি পুলিশ।
আড়াই মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিভিন্ন বস্তা থেকে বের করা হচ্ছে হেলমেট, চেস্ট গার্ড, দেশীয় অস্ত্র। প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সংঘর্ষের। ছোট ছোট শিশুদের সাথে নিয়ে শেখানো হচ্ছে প্রতিপক্ষের উপর হামলা ও আত্মরক্ষার কৌশল। তুলে দেয়া হচ্ছে মারণাস্ত্র রামদা। এমন দৃশ্য শান্তিগঞ্জ উপজেলার গাগলী গ্রামের। গ্রামের আসাদুজ্জামান স্বপন মাষ্টারের চাচাতো শ্বশুর আব্দুল বাসিত বাচ্চু মিয়ার লোকজন এই মহড়া দেন। আতঙ্ক ছড়াতে এসব আবার ভিডিও করে পাঠানো হচ্ছে মোবাইলে মোবাইলে। আগুন দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ঘরে, কেটে ফেলা হয় গাছ। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হুমকিতে প্রাণ ভয়ে ১০ দিন ধরে বাড়িছাড়া স্বপন মাস্টার। গৃহকর্তা পালিয়ে পালিয়ে থাকায় অসহায় দিন কাটছে পরিবারের।
স্বপন মাষ্টার বলেন, আমার মূল বাড়ি ময়মনসিংহ। ১৫ বছর আগে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে জায়গা কিনে গাগলী গ্রামে বসবাস করি। এখন তাদের সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় তাদের কাছ থেকে ক্রয় করা জায়গা তাদের দিয়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। একদিন আমাকে মারধরও করা হয়েছে। এরপরও ক্ষান্ত না হয়ে আমি বাচ্চাদের পড়াতাম একটি ঘেও ওঠাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, কেটে ফেলেছে আমার কয়েকটি গাছ। আমাকে প্রাণে মারার জন্য অস্ত্র সহ মহড়া করে সেই ভিডিও পাঠিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমি প্রাণভয়ে ঘরছাড়া। পুলিশের কাছে ভিডিওসহ অভিযোগ জানানোর পরও তারা কোন কিছু উদ্ধার বা কাউকে গ্রেফতার করতে পারে নি। আমার এই এলাকায় কেউ নাই, তাদের অনেক বড় গোষ্ঠী। সেই শক্তি ব্যবহার করে আমার জায়গা জমি দখল করতে চায় তারা।
স্বপন মাষ্টারের স্ত্রী সুরমা আক্তারের সাথে কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, প্রতিনিয়ত আমার স্বামীকে গুম, খুন করার হুমকি দিচ্ছে আমার চাচা ও তার লোকজন। ভয়ে আমার স্বামী ঘরের বাইরে থাকেন। ৪ টি ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে আমি একা ঘরে সব সময় আতঙ্কে থাকি। আমাদের বাঁচানোর কি কেউ নেই দেশে। আমরা কি সুষ্ঠু বিচার পাবো না।
যাদের হাতে কলম তুলে দেয়ার কথা তাদেরকে দেয়া হচ্ছে সংঘর্ষের প্রশিক্ষণ। এমন ভিডিও দেখে আতঙ্কিত গ্রামের অন্যান্যরা। উচ্ছৃঙ্খল হওয়ায় সমাধানে ব্যর্থতার কথা জানালেন শালিসি ব্যক্তিত্বরা। গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, কারো সাথে ঝগড়া বিবাদের ইতিহাস নেই স্বপন মাস্টারের। গ্রামের যতগুলো উন্নয়ন মূলক কাজ আছে সব কাজেই আছে স্বপন মাষ্টারের সম্পৃক্ততা। এলাকার উন্নয়নেই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
গ্রামের শালিশি ব্যাক্তিত্ব ফখরুজ্জামান বলেন, দু পক্ষের এই বিবাদ অনেক দিনের। কিন্তু যে হাতে কলম তুলে দেয়ার কথা, সেই শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার ভিডিও দেখে আমরা গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত। আমাদের গ্রামের একটা ইতিহাস ঐতিহ্য আছে। এই ভিডিও সেই ইতিহাস কলঙ্কিত করেছে। স্বপন মাষ্টার শালিশ মানলেও বাচ্চু গোষ্ঠী বৈঠকের ডাক দিয়েও বসে না। এরপর আর আমরা খোঁজ খবর নেইনি।
প্রবীণ শালিশি ব্যাক্তি আব্দুল গফফার বলেন, স্বপন মাষ্টারকে শুধু আমরা না প্রশাসনের সবাই এই গ্রামের জামাই হিসেবে চিনে। কারণ তিনি এলাকার উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু তার সাথে তার চাচা শ্বশুরের গোষ্ঠীর বিবাদ অনেক আগের। আমরা চেষ্টা করেছি শালিশের মাধ্যমে শেষ করার। কিন্তু তার চাচার গোষ্ঠী শালিশে না আসলে আমরা জোর করে আনতে পারবো না। আমরা জোড়াজুড়ি করতে গেলে আরও ঝামেলা হবে। পাঞ্চায়েত তো আর ঝামেলা বাড়াতে পােও না। তাই তারা দু পক্ষই আইনের মাধ্যমে যা করার করছেন।
অভিযুক্ত চাচা শ্বশুর বাচ্চু মিয়াকে বাড়িতে গিয়ে পাওয়া না গেলেও সত্যতা স্বীকার করে ভিডিওটি পুরাতন দাবি তার বড় ভাই আব্দুল্লাহর। তিনি বলেন, বছর খানেক আগে দিরাই রাস্তায় মারামারি হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার আগে এই ভিডিও হয়তো কেউ করেছে। পুলিশ এসে আমাদের বাড়িতে কিছুই পায় নি।
অভিযোগ পেয়ে প্রাথমিকভাবে অভিযান চালালেও অস্ত্র উদ্ধার বা আসামী গ্রেফতার কিছুই করতে পারেনি শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশ ।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি মো আকরাম আলী বললেন, আমরা অভিযান চালিয়েছি কিন্তু কিছুই পাই নি। আমাদের ধারণা ভিডিওটি পুরাতন। তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন