প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৫ ২২:০৪
জামালগঞ্জের পাকনার হাওর
হাওর ও জলাভূমি প্রকৃতির অপার সম্ভাবনার আধার। বছরের একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে হাওর, প্রতিটি সময়ই উপভোগ্য। বৈশাখে ফসল তোলার সময় হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার ব্যস্ততায় ভরপুর থাকে হাওর। অন্যদিকে শীতে হাওরে থাকে অতিথি পাখির বিচরণ। বর্ষায় হাওরের মাঝে ছোট—বড় দ্বীপের মতো ভেসে থাকে গ্রাম। বিকেলে সূর্যে্যর মায়াবতী দৃশ্য কিংবা সন্ধ্যার স্নিগ্ধতায় দেখা যায় দূর বহুদূর গ্রামের পাশে সূর্যে্যর নীল আভা। সবকিছু সৃষ্টিকর্তা যেন অকৃপণ হাতে সাজিয়েছেন। হাওরের ভরা পানিতে ছোট ছোট নৌকায় টর্চ লাইটের আলোতে মৎস্য শিকারীদের বিচরণ দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। হাওরের পানিতে চাঁদের আলোর মায়াভরা স্মৃতি যেন প্রতিটি মানুষের হৃদয় কাড়ে। চাঁদনী রাতে নৌকায় বেড়ানো আর ছোট বড় ঢেউয়ে দোল খাওয়া স্মৃতি যেন ভোলার নয়। আবার বাতাসে দমকা হাওয়ায় গর্জে উঠা আপন (ছোট বড় ঢেউ) আতংকে বদলে যায় প্রকৃতির মোহনীয় রূপ। যা স্বচক্ষে না দেখলে আফসোস থেকে যাবে মানুষের। আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যে রয়েছে হাওরের অবদান। বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম ও রাধারমণের হাত ধরে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে হাওরের মানুষের সংগীত।
হাওরে শুকনা মৌসুমে অর্থাৎ কার্তিকের শেষ দিকে দেখা যায় বিস্তীর্ণ সবুজ আর সবুজ। নিম্নাঞ্চলে সবুজ ফসলের হাসি আর উচু জায়গায় সবুজ গাছ আর গাছ। হাওরের বুকে অঁাকাবাঁকা নানা খাল, বিল, ডোবা, ছাড়াও নদীতো আছেই। বিল যা জলমগ্ন এলাকাগুলো মাছের অভয়ারণ্য। নদীর দুইপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ হিজল করছের বাগান। এই বাগানে শীতে পাখীর কলকাকলীতে প্রানবন্ত হয়ে উঠে। বর্ষায় এই সময়ে পাকনার হাওরে কানাইখালী মরা নদীর দুই পাশে, মাতারগাঁও আগার গাঙ্গের পাশে, ফেনারবাক শান্তিপুরের বাগে রয়েছে হাজার হাজার হিজল করচ গাছ। যা দেখলে যে কোন মানুষের প্রাণ জুড়ায়। নদীর প্রবাহমান ে¯্রাত না থাকায় হাওরের বুকে কানাই খালি নদী এখন লেকের মতো। প্রতি বছর শীতের মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে থাকে এই জলরাশি। চারদিকে সবুজের সমরোহ বিশাল জলরাশিতে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির ভেসে বেড়ানোতে সকাল সন্ধ্যায় যেন এক অপরূপ রূপ ধারণ করে।
দূর দূরান্ত থেকে অনেক সময় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সমাজিক সংগঠন বিভিন্ন সময় এই হিজল করচ বাগানে পিকনিক করতে আসেন। পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএস প্রায় ২০ বছর আগে জামালগঞ্জের পাকনার হাওর, শনির হাওরে সরকারি খাস জায়গায় হিজল করচের গাছ লাগায়।
.jpg)
আমাদের দেশে ঋতু ভেদে ভ্রমণের জায়গা খেঁাজার বিষয়ে অনেকের আগ্রহ রয়েছে। বর্ষায় যদি ভ্রমণে বের হন তাহলে জামালগঞ্জের কয়েকটি জায়গায় নাম রাখতে পারেন আপনার তালিকায়। বিশেষ করে জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের মাতারগাঁও, বিনাজুরা, দৌলতপুর, উজান দৌলতপুর ও ফেনারবাকের কানাই খালীর নদীর দুপাশে হিজল করচ বাগান উল্লেখযোগ্য। এসব জায়গায় নৌকা ভ্রমণে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই পাকনার হাওরে ভ্রমণে আপনি পাবেন অদ্ভুত অনুভুতি। চারিদিকে সবুজ গাছের ছায়ায় পানির রং সবুজ আকার ধারণ করে হয়ে উঠে জলরংয়ের ছবির মতো। তবে আসল আনন্দ রাতে। আকাশে রূপালী চাঁদ চাঁদের আলোয় গাছের মোহনায় রূপ। হয়তো আপনি এখানেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির খোজ পাবেন। বিশাল হাওরের মাছ ধরার জেলেদের কাছ থেকে কিনতে পারবেন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
এসব নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে হলে সুনামগঞ্জ থেকে গাড়িযোগে অথবা নেত্রকোনা—মোহনগঞ্জ থেকে নৌকা অথবা স্পীডবোট যোগে জামালগঞ্জ হয়ে ভীমখালী ইউনিয়নের কারেন্টের বাজার থেকে ছোট বড় নৌকা দিয়ে আপনি ঘুরতে পারবেন হিজল করচ বাগান।
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর সিএনআরএস এর কো—অর্ডিনেটর ছাইফুল চৌধুরী জানান, সিএনআরএস একটি পরিবেশবাদী সংস্থা। দুই দশক ধরে হাওর অঞ্চলের হাওরপাড়ের মানুষের জীবন জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছে। পাকনার হাওর সহ বিভিন্ন হাওরে প্রায় দশ লক্ষ হিজল করচের গাছ রোপণ করা হয়েছে। যা এখন হাওরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, পরিবেশ রক্ষা করছে এবং বিভিন্ন দেশিও পাখি—জলজ প্রাণীর আবাস স্থলে পরিণত হয়েছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকীন নুর জানান, পর্যটনের সম্বাবনা জামালগঞ্জের অনেক জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাকনার হাওরের হিজল করচ বাগান। পর্যটকরা যাতে হাওরের সৌন্দর্য্য অবলোকন করতে পারেন, সেজন্য হাওরে একটি ওয়াচ টাওয়ার করে দেওয়া হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সকল ধরণের সহযোগিতা করবে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন