প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০০:৩১
সংগ্রামী মা পিয়ারা বেগম
বাঁ থেকে শিপা, রূপা, সংগ্রামী মা, নীপা ও নাঈম
যখন পিয়ারা বেগমের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছিলাম তখন বাইরে তছনছ করা বৃষ্টিহচ্ছিল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারকে ছাপিয়ে গেলো বৃষ্টির দীর্ঘস্থায়ীত্ব। বৃষ্টি যতইবাড়ছিলো পিয়ারা বেগম ও তার মেয়ে রূপার মুখ ততই মলিন হচ্ছিলো। ভাড়া বাসায়থাকেন। তুলনামূলক নিচু জায়গায় ঘর। এমন বৃষ্টি হলে ঘন্টা দু’য়ের মধ্যেজলাবদ্ধতার পানি ঘরে প্রবেশ করবে। তাই মা—মেয়ের চোখেমুখে আতঙ্ক আর বিরক্তিরছাপ। ঘর বদলাচ্ছেন না কেনো— এমন প্রশ্নে পিয়ারা বেগমের সরল সহজ আবেগমাখাস্বীকারোক্তি, ‘নূরুল ইসলাম স্যার আমাকে এ ঘরে রেখে পরপাড়ে পাড়ি দিয়েছেন। চারছেলে—মেয়ের তিন জনেরই এখানেই জন্ম। সকলের পড়াশোনা, বেড়ে উঠা এখানেই। সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে এ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী বাসায় এসে প্রাইভেটপড়ে। রূপা আর আমি মিলে পড়াই। জীবনের সংগ্রামটা এখান থেকেই শুরু করেছি, আমি এবংছেলে—মেয়েদের স্বপ্নটাও এ টিনের চালের দুই কক্ষের বাসা থেকেই দেখেছি। তাই এবাসা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। এলাকার মানুষও পরম আত্মীয়ের মতো আগলে রাখেন।
কষ্ট হলেও এখানেই থেকে যাচ্ছি৷ নিজে কিছু একটা করতে পারলে তখন বাসা পরিবর্তনেরকথা ভাববো। এর আগে নয়।’শিক্ষা সংগ্রামী এক মায়ের গল্পের শুরু এটা। পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ডকলেজের প্রাক্তন শিক্ষক মো. নূরুল ইসলামের স্ত্রী পিয়ারা বেগম। তিন মেয়ে ও একছেলেকে নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে আছেন ভাড়া বাসায়। বর্তমানে শান্তিগঞ্জের পশ্চিমপাগলা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা তারা। শিক্ষক নূরুলইসলাম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় একযুগ আগে ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর শুক্রবারেমৃত্যুবরণ করেছিলেন। পাঁচ জনের সংসার পিয়ারা বেগমের। স্বামী গতহওয়ার পর থেকে জীবনের সংগ্রাম শুরু তার। সংসার চালিয়ে নেওয়া, মেয়ে—ছেলেদেও মানুষের মতো মানুষ করা, পড়াশোনা করানো, স্বামীর রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা ওঅসমাপ্ত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটানো। সব কিছু মিলিয়ে প্রচণ্ড চাপে পিয়ারা বেগম। তবু ভেঙে পড়েন নি। ৪র্থ, ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দিয়েশুরু করেন বাসায় প্রাইভেট পড়ানো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত চলছে জীবনের কঠিন হিসেবেনিকাশ। হিসেবের খাতায় ভুলও করেন নি তিনি। বড় মেয়ে সুনামগঞ্জ থেকে মাস্টার্স,নীপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স—মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম। শিপা ও এক মাত্র ছেলে নাঈম পিইসি, জেএসসি, এসএসসিসহ অংশগ্রহণকৃত সকল পরীক্ষায় জিপিএ—৫, মেধাবৃত্তি, শিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। এই দু’জন বর্তমানে সিলেটেরএমসি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছেন।
ফারহানা ইসলাম রূপা এ পরিবারের বড় মেয়ে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকেঅর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণি পেয়ে অনার্স শেষ করেছেন ২০২১ সালে। সিলেটেরমুরারিচাঁদ কলেজ থেকে গত বছর মাস্টার্স শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেনতিনি। পাশাপাশি মায়ের সাথে বাসায় শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে অন্যান্য ভাইবোনদেরসহযোগিতা করছেন। তার ইচ্ছা যেকোনো একটি চাকরিতে যোগদান করে সংসারের হাল ধরবেন। বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। ভাই—বোনদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়েতুলবেন।
শায়লা ইসলাম নীপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। কৃতিত্বপূর্ণ এফলাফলের জন্য ঢাবি থেকে পেয়েছেন ডিন’স এ্যাওয়ার্ড—২০২২। পাশাপাশি স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার জন্য নীপা স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছেন। ১৯ নভেম্বরঢাবির ৫৩তম সমাবর্তনে তাকে ড. আবদুল জলিল মিয়া স্বর্ণপদক—২০২০ পড়িয়ে দেনতৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদ। এর আগে তিনিশান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসিতেজিপিএ—৫ এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ—৫ অর্জন করেছিলেন।
সায়মা ইসলাম শিপাও পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে
বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ—৫ পেয়েছিলেন। বর্তমানে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে একই
বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। তার ইচ্ছা ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা
করা।
সবার ছোট আশরাফুল ইসলাম নাঈম। ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাগলা সরকারি মডেলহাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ—৫ পেয়ে বর্তমানে এমসি কলেজেএকাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। ভবিষ্যতে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো মানের প্রকৌশলী হয়ে বের হতে চান।
শুধু জিপিএ—৫ নয়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার যতগুলো বৃত্তি পরীক্ষা, মেধাবৃত্তি ছিলোতারা সবাই সবগুলো অর্জন করেছিলেন নিজেদের যোগ্যতা বলেই।
পিয়ারা বেগম জানান, রূপা যখন এসএসসি পরীক্ষা দেবে তখন তাদের বাবা স্ট্রোককরেন। আমি অসহায় হয়ে পড়ি। কূলকিনারাহীন সাগরের মাঝে পড়ে যাই। কিছু বুঝে উঠতেপারছিলাম না। নীপা, শিপা ও নাঈম অনেক ছোট। তাদের ভরণপোষণ, লেখাপড়া, নিরাপত্তাসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেহবে। ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। বাচ্চাদের বাবা মারা যাওয়ার মাসছয়েক পরে বাসাতেই স্টুডেন্ট পড়াতে শুরু করি। ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, মাঝেমাঝে ৬ষ্ঠ—৮ম শ্রেণি। সকলের সহযোগিতায় আমার বড় মেয়ে এসএসসি পাশ করলো। ভালোরিজাল্ট করেছে। এতো বড় একটি ধাক্কা না খেলে সেও এ প্লাস পেতো। ইসলামিক রিলিফবাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন আমাকে ও আমার পুরো পরিবারকে খুব সহযোগিতা করেছে।এখনো করছে। পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকগণ, চেয়ারম্যান, মেম্বার, যুবসমাজ, পাগলা স্কুলের প্রাক্তন—বর্তমান শিক্ষার্থীসহ এলাকার সকলেইআমাদেরকে পরম আত্মীয়ের মতো সহযোগিতা করেছেন। এখনো তারা আমাদের ভালোবাসেন,শ্রদ্ধা করেন, স্নেহ করেন। পূজা, বিয়ে, ঈদসহ যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেএলাকাবাসী আমাদের দাওয়াত করেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় যাওয়ার সময় আমাদেরআশির্বাদ নিয়ে যায়। অনেক সম্মান করেন তারা আমাদের।
তিনি বলেন, তাদের বাবা নাই। সন্তানদের কৃতিত্ব দেখে যেতে পারেন নি। এই কষ্ট আমার বুকে সর্বক্ষণ থাকে। কাউকে বুঝতে দেই না। কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন বার বার চোখ মুছে কান্না আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টাকরছিলেন রূপা। মা পিয়ারা বেগম সে কান্না আর লুকিয়ে রাখতে পারেন নি। অঝোরেকাঁদছিলেন।
কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো চারদিক। টিনের চালে তছনছ করাবৃষ্টির অবিরাম রিমঝিম। বার বার মো. নূরুল ইসলাম স্যারের চোখমুখ ভেসে উঠছেচোখের সামনে। দোয়ারাবাজারের সুরমা ইউনিয়নের আলীপুরের বাসিন্দা ছিলেন প্রয়াত শিক্ষক নূরুল ইসলাম। তাঁর স্ত্রী সন্তান বর্তমানে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমপাগলা ইউনিয়নের নাগরিক। নীরবতা ভেঙে জানতে চাই— জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে কি না? পিয়ারা বেগম বলেন, না। কোনোঅভিযোগ নেই। যা হবার তা হবেই। তবে কিছুটা আক্ষেপ আছে। তাদের (রূপার দিতেইঙ্গিত করে) বাবাকে যদি আরো কিছুটা সময় পেতাম হয়তো আরও ভালো কিছু হতো। তবে,যা হয়েছে তাতেই আমি খুশি।
ঢাকায় একটি গবেষণা কর্মে লিপ্ত আছেন শায়লা ইসলাম নীপা। মুঠোফোনে কথা হয় তারসাথে। বাবার স্বপ্ন, মায়ের ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রম, নিজেদের পড়াশোনা ইত্যাদি বিষয়েজানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবা আমার স্বপ্ন আর প্রেরণা শক্তি। জীবনের সাথে সংগ্রাম করে মা আমাদের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তিনিই মূলত আমাদের প্রেরণারবাতিঘর। আমাদের বাবা চলে যাওয়ার পর একা মায়ের পক্ষে চারজন ছেলেমেয়ের পড়াশোনাচালিয়ে নেয়া খুব সহজ ছিলো না। আমরা এখনো নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টাচালিয়ে যাচ্ছি।
ফারহানা ইসলাম রূপা বলেন, মানুষের মতো মানুষ হয়ে আমরা বেড়ে উঠতে চাই। মানুষেরজন্য কাজ করতে চাই। বাবার নাম সমুজ্জল করতে চাই। মাকে সাথে নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সকলের দোয়া চাই।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন