প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৫ ২৩:৫৮
এক বছরে ৪ জনের মৃত্যু
‘৫০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের র্যাটহোল, কখনো হামাগুঁড়ি ,কখনো নুঁয়ে হেঁটে র্যাটহোলে প্রবেশ করতে হয়। সেখানে গাঁইতি, শাবল, বেলচা দিয়ে টুকরো টুকরো কয়লা উত্তোলন করে বস্তায় ভরে অমানবিক পরিশ্রম করে দেশে নিয়ে আসে বাংলাদেশি শ্রমিকরা। অবৈজ্ঞানিক ও অনিরাপদ পন্থায় কয়লা সংগ্রহকালে ঘটে দুর্ঘটনা। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে কয়লা আনতে গিয়ে সরকারি হিসেবেই গেল এক বছরে চারজন মারা গেছে। আহত হয়েছে অসংখ্য হতদরিদ্র শ্রমিক। অথচ এমন ঝুঁকি ও কঠোর পরিশ্রম করে এরা দিনে হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারছে না। স্থানীয়রা বলছেন, কর্ম সংস্থানের সুযোগ না থাকায় ঝুঁকি নিচ্ছেন অভাবি মানুষেরা। ভারতের অভ্যন্তরে কাজ করতে যাওয়া কয়েকজন শ্রমিক নাম উদ্ধৃত না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, ওখানে সুনামগঞ্জ সীমান্ত এলাকার কমপক্ষে ৮০০ শ্রমিক কাজ করে।
বিজিবির টহল ও নজরদারি এড়িয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে র্যাটহোলের (পরিত্যক্ত কয়লা আনার সুরঙ্গ) কয়লা আনতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষ। মজুরি কম হওয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজে লাগাচ্ছে মুনাফালোভী ভারতীয় র্যাটহোলের মালিকরা। তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় এমন ঘটনার প্রবণতা বেশি। স্থানীয়রা বলছেন, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় অবৈধপথে কয়লা আনতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হচ্ছে গরিব শ্রমিকদের। বিজিবি বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ ও অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধে বিজিবি টহল কৌশলে পরিবর্তন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সবুজ শ্যামল প্রকৃতি আর সবুজ বৃক্ষরাজি লতাপাতা-গুল্ম শোভিত মনোমুগ্ধকর পাহাড়ের ভাজে ভাজে লুকিয়ে আছে র্যাটহোল নামের ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। মেঘালয়ের পরিত্যক্ত কয়ল খনিতে এসব বিপদজনক র্যাটহোল রয়েছে। সঞ্চিত কয়লা সংগ্রহ করার পর খনিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত খনিতে তৈরি হয় র্যাটহোল বা ইঁদুরের গর্ত। প্রতিটি কয়লার বস্তা শ্রমিকরা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ধরে বিক্রি করতে পারেন। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২ বস্তা কয়লা আনতে পারেন তারা।
এছাড়াও ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে নোকলা, কুলাংসহ বিভিন্ন পরিত্যাক্ত র্যাটহোলে বাংলাদেশীরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু মানুষ এসব পরিত্যক্ত র্যাটহোলে কাজ করতে যান। একদিকে সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব, অন্যদিকে ভারতীয় মুনাফালোভী কোয়ারির মালিকরা কম মজুরিতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের পাওয়ায় ওখানে এপারের শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। বাধ্য হয়েই কম মজুরিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের, এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
বিজিবির টহল ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম, বিকল্প কর্মসংস্থানের সব উদ্যোগ থাকলেও তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ও শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ট্যাকেরঘাট, লালঘাট, লাকমা, বাগলী, রজনীলাইন, চাঁনপুর সহ প্রায় ২০ টি গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। বিজিবির টহল দলের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে উঁচু— নিচু সরু গর্তের অন্ধকারচ্ছন্ন ট্যানেলে প্রবেশের পর দেয়াল ধস, পাথর ধস, মাটি ধস, শ্বাসকষ্ট, দিকবিভ্রান্তি ও প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে মারা যান তারা।
তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের বাসিন্দা মো.নুর মিয়া। বাবা অনেক আগে মারা গেলেও মা কমলা বেগম এখনও জীবিত রয়েছেন। এই পরিবারে স্ত্রী মাফিয়া বেগমসহ ৪ সন্তান। মোট সাত জনের সংসার। এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় চলতি বছরের ১ মে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয়ের
র্যাটহোল থেকে কয়লা আনতে যান তিনি। দু’দিন পর মা কমলা বেগম ও স্ত্রী মাফিয়া বেগম জানতে পারেন নুর মিয়া মাটি চাপায় মারা গেছে। পরে ৩ মে নুর মিয়ার মরদেহ পেয়ে সমাহিত করা হয়। সন্তানের শোকে মা কমলা বেগম এখনও স্বাভাবিক হননি। নুর মিয়ার কথা মনে হলে এখনও কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। তিনি বললেন, আমার একমাত্র ছেলে নুর মিয়া। তার বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। এরপর থেকে সংসারের হাল ধরেছে সে। তার আয় দিয়ে সংসার চলতো। পাহাড়ে কাজে গিয়ে মারা গেছে। এখন খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিন পার করছি।
স্ত্রী মাফিয়া বেগম বললেন, এলাকায় কোনো কাজ নেই। কাজের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে যাওয়া। সেখানে মাটি চাপা পড়ে মারা গেছেন। এরপর থেকে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে। বাবার বাড়ি থেকে কিছু সহযোগিতা পেয়ে এই কয়েক মাস সংসারের খরচ চালিয়েছি। এলাকায় কোনো কাজ নেই, তাই বড় ছেলে শাহিনুরকে তার মামারা সিলেট নিয়ে গেছে। ওখানে কোনো কাজে লাগাবে। বাড়িতে থাকলে বাবার মতো কাজে যুক্ত হতে হবে, তাই আমিও সম্মতি দিয়েছি।
একই গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল খালেকের ছেলে নুরুল হক প্রায় ২ বছর আগে র্যাটহোল থেকে কয়লা আনতে গিয়ে মাটি চাপায় মারা যান। তার বড় ভাই মো. আতাউল্লাহ বলেন, এলাকায় কোনো কাজ নেই। অভাবেব কারণে পাহাড়ে যেতে হয়। সংসার চালাতেই ছোট ভাই নুরুল পাহাড়ে গেছিলো। সুরঙ্গের ভেতর ঢুকার পর মাটি চাপায় মারা যায়। পরে অন্যরা গিয়ে মাটি সরিয়ে তাকে নিয়ে আসে।
স্থানীয়রা বলছেন, জেলায় একমাত্র বোরো ফসল ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে কয়লা আনতে যাচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ।
লাকমা গ্রামের পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. হাসান আলী বলেন, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কয়লা আনতে কেউ ইচ্ছে করে যায় না। এলাকায় কোনো কাজের ব্যবস্থা নেই। মানুষ চলবে কী করে। অনেকেই শহরমুখী হচ্ছেন। যারা শহরে যাচ্ছেন না তারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন।
একই গ্রামের বাসিন্দা মো. আলকাছ মিয়া বলেন, পেটের খিদায় মানুষ ডাকাতিও করে। শুকনায় বোরো ফসল করে, কিছু কাজ থাকে। বর্ষায় কোনো কাজ নেই। বউ—বাচ্চা নিয়ে সংসার চালাবে কী করে। এজন্য চোরাই পথে কয়লা আনতে যায়। আরও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সরকার এখানে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিলে মানুষের খুবই উপকার হবে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১ বছরে অবৈধভাবে কয়লা আনতে গিয়ে মাটি চাপায় ৪ জন মারা গেছেন। ৫ লক্ষ ২০ হাজার ৮৫ টন কয়লা জব্দ করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪১ হাজার সাতশ’ টাকা।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল একেএম জাকারিয়া কাদির বলেন, জীবনের ঝুঁকি জেনেও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় স্থানীয়রা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কয়লা আনার চেষ্টা করে। এতে অনেকে বিপদের সম্মুখিন হচ্ছেন। এটি রোধ করতে কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় টহল বাড়ানোসহ সীমান্তবর্তী এলাকাবাসির বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয়দের আমরা মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করেছি। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলে অবৈধভাবে কয়লা আনার প্রবণতা হ্রাস পাবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন