হাওর-নদী

প্লাস্টিক-পলিথিনে সয়লাব

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০০:৪৮

হাওর—বাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। জেলার ১২টি উপজেলার কোনো না কোনোভাবে হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। প্রতিবছর এই হাওরের প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান হয়। যা থেকে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৩ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিকটন ধান। তবে অধিক প্লাস্টিক, পলিথিনের কারণে নষ্ট হচ্ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। উর্বরতা হারাচ্ছে ফসলি জমি। এসব অপচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থাপনা নিয়েও নেই প্রশাসনের কোনো পরিকল্পনা।


পর্যটন এলাকায় পর্যটকসহ স্থানীয়দের প্লাস্টিক বোতল, পলিথিনসহ অপচনশীল বর্জ্য এর কারণে দূষিত হচ্ছে হাওরের পরিবেশ। পর্যটকদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অপচনশীল বর্জ্য স্থানীয় মানুষজন তৈরি করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নির্ধারিত জায়গায় বর্জ্য সংরক্ষণের কথা জানালেও রিসাইকেলের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা বা ধ্বংস করার কোনো পরিকল্পনা বা নীতিমালা নেই হাওরাঞ্চলে। ফলে দিনে দিনে হাওরের দূষণ বাড়ছে।


তাহিরপুরের উল্টর শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর বাজার। বাজারে স্থানীয়দের দুইশ’টির বেশি দোকান রয়েছে। এই বাজারের ক্রেতা আশেপাশের চার থেকে পাঁচটি গ্রামের মানুষ। বাজারে বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে ২৫ টি দোকানে রেফ্রিজারেটর রয়েছে। যেগুলোতে রেখে টাইগার, স্প্রিট, কোকাকোলাসহ অনেক কোম্পানির কোমল পানিয় বিক্রি হয়। প্রত্যেক দোকান হতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ টি করে কোমল পানির বোতল বিক্রি হয়। এসব কোমল পানিয় পান করে খালি বোতলগুলো বাজারেই ফেলে দেয়া হয়। এছাড়াও পলিথিন প্যাকেটজাত পণ্যের প্যাকেট বাজারেই ফেলা হয়। 


বাজারের পাশের গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল কাহার বললেন, আমাদের বাজারে পর্যটকেরা বেশি আসে না। স্থানীয়রাই কেনাকাটা করেন। প্রতিদিন তিনশ’টির বেশি কোমল পানির বোতল বিক্রি হয়। এসব বোতল দোকানে ও নদীতে ফেলা হয়। যেগুলো বাজারের মধ্যে পড়ে থাকে সেগুলো বৃষ্টি হলে ঢলের পানিতে পাটলাই নদীতে গিয়ে পড়ে। 


শ্রীপুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ইমানুর মিয়া বললেন, এই বাজারের ক্রেতা আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, এ বিষয়ে স্থানীয়রা সচেতন নয়। পলিথিনের প্যাকেট সব নদীতে ফেলা দেয়া হয়। এতে ফসলি জমি ও নদীর পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।


জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, ৩৭৪৭.১৮ বর্গ কি.মি. আয়তনের পুরো জেলার লোকসংখ্যা ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৪ জন। এই বিশাল জনসংখ্যার কেনাকাটার জন্য বাজার রয়েছে ১১২ টি। যেখানে নিয়মিত স্থানীয়রা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন। ২০২১ সালে পুরো জেলার শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসে।


উন্নয়নকর্মী ইয়াহিয়া সাজ্জাদ বলেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা একসঙ্গে করতে হবে। পরিবেশকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন টেকসই হবে না। প্লাস্টিক পলিথিন হাওরাঞ্চলে যেভাবে পড়ছে, এর প্রভাব এখন দেখা না গেলেও ১৫ বছর পর আমরা বুঝতে পারবো। এটি বন্ধ করতে হলে জাতীয়ভাবে হাওরাঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনা দরকার।


তিনি বলেন, প্লাস্টিক, পলিথিন রিসাইকেল করতে হবে। অনেক উন্নত দেশে প্লাস্টিকের বোতল নির্ধারিত জায়গায় জমা দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থায় স্থানীয়রা নিজ থেকেই উৎসাহিত হয়ে প্লাস্টিক জমা দেয়। আমাদের এখানেও সাধারণ মানুষকে এভাবে উৎসাহিত করতে হবে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, বিভিন্ন বাজারে ফেলা প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন ড্রেনের মাধ্যমে নদী ও হাওরে এসে পড়ছে। এই বর্জ্য যেহেতু অপচনশীল ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। তবে এখনও এমন অভিযোগ আসেনি বলে জানান তিনি।


তাহিরপুরের সবচেয়ে বড় বাজার ‘বাদাঘাট বাজার’। স্থানীয় কথা আছে, প্রয়োজনীয় এমন কিছু নেই যা এই বাজারে পাওয়া যায় না। 
বাজার কমিটির সভাপতি সেলিম হায়দার বললেন, আমাদের বাজারের নাম—ডাক চারদিকে আছে। উপজেলার সবাই এই বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন। তবে দোকানীদের দ্বারা প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ যেখানে সেখানে ফেলার কথাও তিনি জানালেন।

 

তিনি বললেন, আমরা প্রায়ই মাইকিং করে দোকানিদের বলি ময়লা—আবর্জনা নিদিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণ করতে। তারা তা না করে নদীর ঘাটে ফেলে আসে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এটি রোধ করতে হলে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে।


পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বললেন, প্রতিটি বাজার, উপজেলা এবং জেলায় বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুরো বাজারের বর্জ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করা হবে। সকল বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ঘটানো দরকার। এখন কোনো ব্যবস্থাই চালু নেই। স্থানীয়রা যে যার মতো বর্জ্য ফেলছে। এখন যেকোনো বাজারের ঘাটে গেলেই দেখা যায় পলিথিন, ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। যেগুলো নদী ও হাওর দূষণ করছে। 


চলতি বছর জেলা প্রশাসন পর্যটকবাহী নৌযান ও হাউজবোট ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২৩ প্রকাশ করেছে। সেখানে প্লাস্টিক, পলিথিন নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণসহ নৌযান চলাচলের বিধি—নিষেধ প্রণয়ন হয়েছে। নৌযান ও হাউসবোটের বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে সেফটিক ট্যাংকে নির্গমন নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। 


সুনামগঞ্জ হাউজবোট এসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুক উর রহমান বললেন, আমাদেরকে বলা হয়েছে হাউসবোটে বর্জ্য রাখার সেফটিক ট্যাংক রাখতে। তবে বর্জ্য পাম্পিং স্টেশন না থাকায় আমরা এটি ব্যবহার করতে পারছি না। এজন্য মানুষের বর্জ্য হাওরেই ফেলা হয়। তবে কোনো হাউসবোটে প্লাস্টিক পলিথিন ব্যবহার করা হয় না বলে জানান তিনি।


সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন বললেন, হাওরে বেড়াতে এসে পর্যটকেরা যাতে পলিথিন ও প্লাস্টিক পানিতে না ফেলে এজন্য প্রতিটি নৌকাকে আমরা ২ টি ডাস্টবিন দিয়েছি। একটি লাল, অন্যটি সবুজ। সবুজ বিনে পচনশীল বর্জ্য ও লাল বিনে অপচনশীল বর্জ্য রাখবে তারা।
হাউজবোটের কতৃর্পক্ষ পলিথিন ও প্লাস্টিক সংরক্ষণের পর সেগুলো কোথায় ফেলবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করার কথা বললেন।


জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, স্থানীয়দের অপচনশীল বর্জ্য নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণ করার জন্য বলা হয়েছে। এজন্য স্থানীয় মানুষদের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সচেতন করছি আমরা। 
হাওরে পর্যটকদের অপচনশীল বর্জ্য নৌকা— হাউজবোটে সংরক্ষণ করার পর সেগুলো কোথায় ফেলবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাওর এলাকায় নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য শহরে নির্ধারিত স্থানে ফেলার জন্য বলবো আমরা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার