দুর্ভোগে ৩ জেলার মানুষ

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৫ ২২:১৬

সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ ও জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ-গাগলাজুর সড়ক

সুনামগঞ্জ—জামালগঞ্জ এবং জামালগঞ্জ—সেলিমগঞ্জ—গাগলাজুর পর্যন্ত সড়ক ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরপুর। অনেক জায়গায় ইট সলিং সরে গিয়ে ছোট—বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে যাত্রী সাধারণকে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দৈনন্দিন যাতায়াতে খুব বিপাকে পড়তে হয় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কর্মজীবী মানুষদের।


জানা যায়, ২০২২ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সড়কপথ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা পরবর্তীতে এই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কপথ সংস্কার করা হয়। নামমাত্র সংস্কার করায় এবং ভাঙা সড়কে ইটসলিং করায় সেই ইট সরে গিয়ে এখন ছোট—বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে চালকদের। 

 


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার শাখাইতি মাদ্রাসা পয়েন্ট থেকে নোয়াগাঁও বাজার— জামলাবাজ—জামালগঞ্জ সড়কপথে অসংখ্য গর্ত, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলা শহরের নয়াহালট থেকে শুরু করে চানপুর ব্রীজ পর্যন্ত খানাখন্দের কারণে রোগী, বয়ষ্ক মানুষ ও শিশুদের নিয়ে যাতায়াতে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সেই ২০২২ সাল থেকে অধ্যাবধি কর্তৃপক্ষ এই সড়ক মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি।  জামালগঞ্জ—সেলিমগঞ্জ সড়ক এবং সেলিমগঞ্জ—গাগলাজুর পর্যন্ত সড়কপথের বিভিন্ন স্থানে সড়কগুলোতে চলাচলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয় এলাকাবাসীকে। এই সড়কগুলোর ভাঙা স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। 


জেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর—জয়নগর পয়েন্ট পর্যন্ত ১০.৭০৯ কিলোমিটার সড়ক গেল ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। ৪.৯ কিলোমিটার সড়কপথ ফ্লাড প্রকল্পের অধীনে (এডিবি জরুরি সহায়তা) মেরামত করা হয়। একই প্রকল্পে সদর উপজেলার জানীগাঁও—জয়নগর বাজার পর্যন্ত ৭.৭১ কিলোমিটার এবং মঙ্গলকাটা —হাসাউড়া (জিসি) ৩ কিলোমিটার সড়কসহ তিনটি সড়ক মেরামতের জন্য ২১ কোটি ৪ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই তিনটি সড়কপথের সংস্কার কাজ ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সমাপ্ত হয়। কাজ বাস্তবায়ন করে সালেহ এন্ড ব্রাদার্স, ক্রাপ্ট কনস্ট্রাকশন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। 

 

 


এদিকে জামালগঞ্জ উপজেলার শহর থেকে জয়নগর পয়েন্ট পর্যন্ত ১১.৩০ কিলোমিটার সড়কপথ রয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে সেলিমগঞ্জ বাজার—আলিপুর—গাগলাজুর পর্যন্ত ১৬.৫ কিলোমিটার সড়কপথ রয়েছে। গেল ২০২২ সালের বন্যায় এই সড়কটি ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সড়কের অ্যাপ্রোচ ভেঙে গেছে, খানা—খন্দে ভরা সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ ছোট ছোট যানবাহন। অসুস্থ মানুষ, বৃদ্ধ এবং শিশুরা যাতায়াতে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হন। 

 


স্থানীয়রা বলেছেন, এসব রাস্তায় বিগত বছরগুলোতে  অপরিকল্পিত ভাবে প্রায় কোটি টাকার কাজ হয়েছে।  কোন কাজই টেকসই হয়নি। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না থাকায় এবং অনিয়ম দুর্নীতির কারণে উপজেলা সড়কের অনেক গাইডওয়াল ভেঙে পড়েছে। এতে প্রতি বছরই সরকারের লাখ লাখ টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। রাস্তা—ঘাটের এমন  পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

 


গজারিয়া গ্রামের গাড়ি চালক মো. মাশুল মিয়া বলেন, আমাদের জামালগঞ্জ—গজারিয়া পর্যন্ত সড়কে যাতায়াতে  রামপুর, সংবাদপুর, চানপুর, নয়াহালট পর্যন্ত অনেক জায়গায় ভাঙা, গর্ত, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের গাইড ওয়াল ভেঙে গেছে। চানপুর ব্রীজের অ্যাপ্রোচ ভেঙে গিয়ে মাটি সরে বিশাল আকারের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদেরকে। এছাড়াও গাড়িতে করে আমরা সুস্থ মানুষ নিয়ে আসতে পারি, কিন্তু অসুস্থ মানুষ, বৃদ্ধ এবং শিশুদেরকে নিয়ে চলাচলে সমস্যা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা জামালগঞ্জ—গাগলাজুর সড়কে।   এই ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে প্রায়ই আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়। এই সড়কপথ সংস্কার করে দিলে আমাদের খুবই  উপকার হবে।


একই গ্রামের মোটর সাইকেলচালক পলাশ মিয়া বলেন, আমরা ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাই। রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় আছে। দিন দিন সড়কপথে খানাখন্দ, গর্ত বাড়ছে। অসুস্থ মানুষ এবং বৃদ্ধ মানুষেরা এই সড়কে আসা—যাওয়া করে না, তারা নৌকায় চলাচল করেন। 

 


চানপুর গ্রামের আজমান আলী একজন মোটরসাইকেল চালক। তিনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান। তিনি বলেন, আমার মতো এইরকম শতশত মোটরসাইকেল চালক, অটোরিকশা চালক এবং সিএনজি চালক রয়েছেন। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটে প্রতিনিয়ত। যাত্রীদেরকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। রাস্তাটি মেরামতের কোন উদ্যোগ নেই। বন্যার পর ভাঙা জায়গায় ইট দিয়ে নামমাত্র সংস্কার করেছে। এই ইটগুলো সরে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাটিতে গাড়ির চাকা ঘোরানোর জায়গা নেই। গাড়ি চালাতে গিয়ে আমরা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ ঠিক রাখতে পারি না, এতে দুর্ঘটনা ঘটে। এই সড়কে অনেকেই আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক নারী—পুরুষ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। একই কথা বললেন গ্রামের মোটরসাইকেল চালক পলাশ মিয়া ও আজমান আলী। 

 


জামালগঞ্জের মান্নানঘাট থেকে রিজার্ভ যাত্রী নিয়ে সুনামগঞ্জে আসছিলেন সিএনজি চালক রফিক মিয়া। তিনি বলেন, গজারিয়া হতে শুরু করে সেলিমগঞ্জ (ভায়া) মান্নানঘাট— জামালগঞ্জ সদর পর্যন্ত সড়ক ভাঙতে ভাঙতে সরু হয়ে গেছে। সীমাহীন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, যাত্রীদেরও দুর্ভোগের শেষ নেই। 


মোহনগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা অ্যাড. শফিকুল ইসলাম সবুজ সিলেট জজ কোর্টে বর্তমানে এপিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সিলেট থেকে প্রায়ই বাড়িতে যান। তিনি বলেন, আমি প্রায়ই গ্রামের বাড়ি ধর্মপাশা হয়ে মোহনগঞ্জে যাই। যাতায়াতে আমাদেরকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার শাখাইতি মাদ্রাসা পয়েন্ট থেকে নোয়াগাঁও বাজার হয়ে জামালগঞ্জ পর্যন্ত সড়কে খানাখন্দে ভরা। এই সড়কটি দিয়ে সাধারণত ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, সিএনজি এবং লেগুনা চলাচল করে থাকে। খানাখন্দভরা সড়কে আমাদেরকে জীবন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। 

 


তিনি বলেন, এই সড়কপথে আসা—যাওয়া করে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। লোকজন নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ জেলা থেকে মোহনগঞ্জ—ধর্মপাশা হয়ে নৌপথে জামালগঞ্জের মান্নানঘাট পৌঁছেন এবং মান্নানঘাট থেকে মোটরসাইকেল ও সিএনজি করে কেউ কেউ জামালগঞ্জ হয়ে ফেরি পারা হয়ে সাচনা থেকে একইভাবে সুনামগঞ্জে আসা—যাওয়া করেন। আবার কেউ কেউ  দিরাই রাস্তা হয়ে সিলেট যান। মান্নানঘাট থেকে জামালগঞ্জ সড়কপথে আসা—যাওয়া খুবই বিপদজনক। রাস্তাটিতে ছোট—বড় গর্ত, খানাখন্দে একাকার। অনেক জায়গায় একটি মোটরসাইকেলের চাকা রাখার মতো ঠাঁই নেই। এতে সুনামগঞ্জের লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার কর্মজীবী মানুষেরা ভোগান্তির শিকার হোন।

 


তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালের বন্যার পর থেকে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষদের। বিগত দিনে উন্নয়নের নামে লুটপাট করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ—মান্নানঘাট—সেলিমগঞ্জ—গজারিয়া—গাগলাজুর সড়কপথ হচ্ছে অনিয়ম দুর্নীতির একটা দৃষ্টান্ত। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করবেন এবং সুনামগঞ্জ তথা ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলার কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি দূর করবেন।


এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা এলজিইডির নিবার্হী প্রকৌশলী মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, জামালগঞ্জ—জয়নগর পয়েন্ট — কাঠইর পর্যন্ত ১১.৩ কিলোমিটার সড়কপথ বেহাল অবস্থায় আছে। প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে। এই রাস্তাটি মেরামতের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছে। 


তিনি বলেন, আমি এই রাস্তাটি মেরামতের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। কর্তৃপক্ষ আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, ২০২৫—২০২৬ অর্থ বছরে জিওবি মেইনটেন্যান্সের মাধ্যমে এই সড়কগুলো সংস্কার করা হবে। একইভাবে জামালগঞ্জ — সেলিমগঞ্জ — মান্নানঘাট— আলিপুর — গাগলাজুর পর্যন্ত সড়কে দশ বছর ধরে কাজ হয়নি। এটাও এই অর্থবছরে সংস্কার করা হবে।

 


সদর উপজেলা এলজিইডির নিবার্হী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার রহমান বলেন, সদর উপজেলার কাঠইর পয়েন্ট থেকে জয়নগর পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কে ইতোমধ্যে তিনটি প্যাকেজের আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সড়কপথে শেষের ভাঙা অংশটুকু ২০২৫—২৬ অর্থ বছর জিওবি মেইনটেন্যান্স মেরামতের জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়াও এই সড়কপথে যে অংশটুকু অতিরিক্ত ভাঙা আছে, সেই ভাঙাটুকু মোবাইল মেন্টেন্যান্সের মাধ্যমে সচল রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০২৫—২৬ অর্থ বছরে জিওবি মেইনটেন্যান্স বরাদ্দের মাধ্যমে এই সড়কপথ সংস্কার করা হবে। আশা করি, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আমরা অনুমোদন পাব, এরপর টেন্ডার আহ্বান করে জামালগঞ্জের দুইটি সড়কপথ সংস্কার করা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার