প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৫ ২২:৫০
জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নের সেরমস্তপুরে পাখির ডাকে ভোরেই ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। গ্রামটি ‘পাখি গ্রাম’ হিসাবেও পরিচিত। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙার পর গ্রামবাসী হয়ে পড়েন কর্মব্যস্ত। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাঠের নৌকা তৈরি ও বেচা—কেনার ধুম পড়ে গ্রামটিতে। বংশপরম্পরায় শত বছরের নৌকা তৈরির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এই গ্রামের কারিগররা। পাখির কিচির—মিচিরের পাশাপাশি নৌকার গ্রাম হিসাবেও পরিচিত লাভ করেছে সেরমস্তপুর।
গ্রামের নৌকা কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাপ—দাদার হাত ধরে বংশ পরম্পরায় শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা। সেজন্য নৌকার গ্রাম হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে সেরমস্তপুর। এখানে নৌকা তৈরি হয় এবং পাইকারী ও খুচরা দরে বিক্রি হয়। প্রতিদিনই গ্রামটিতে নৌকা বেচা—কেনা হয়।
প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩০টি আলংয়ে (নৌকা তৈরির কারখানা) শতাধিক নৌকা বিক্রি হয়। প্রতিটি নৌকা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রয় করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন নকশাজনিত কিংবা ইঞ্জিন চালিত নৌকা ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রয় করা হয়। বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাইকাররা আসেন নৌকা কিনতে।
.png)
সেরমস্তপুর গ্রামের নৌকা কারিগর সায়েদুল মিয়া বলেন, বাপ—দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখাতে এই পেশা বেছে নিয়েছি। এই গ্রামের ৩০টি আলংয়ে প্রায় ৫০টি পরিবার নৌকা তৈরির সাথে জড়িত। এখানে প্রায় শতাধিক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রতি কারিগরকে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয়। ৩ জন কারিগর সপ্তাহে ৬ থেকে ৭টি নৌকা তৈরি করতে পারে। প্রতিটি নৌকায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বিক্রি করা হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। প্রতি মাসে খরচ বাদে ৫০/৬০ হাজার টাকা উপার্জন হয়।
একই গ্রামের কারিগর দেলোয়ার হোসেন, দিলসাদ, সিয়াম জানান, প্রতি সোমবার সাচনা বাজারে নৌকার হাট বসে। আমাদের দাদা, বাবারা এই পেশায় ছিল, আমরা প্রায় ২০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। নৌকা তৈরিতে বেশির ভাগ চাম্বল, মেহগনি, আম কাঠ ব্যবহার করা হয়। তবে এবার বর্ষায় পানি কম হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় বেচাকেনা অনেকটা কম। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বেচাকেনা বেশি হয়। তবে বর্ষায় ছয় মাসই নৌকার চাহিদা বেশি থাকে। হাওরে মাছ ধরতে ও এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াতে নৌকা ব্যবহার করে থাকেন মানুষজন।
আব্দুর রবের ছেলে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মিল এবং কামাল হোসেনের ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান জানায়, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নৌকার পাতাম লাগানোর কাজ করি। ঘন্টায় ১ শত থেকে দেড়শত পাতাম লোহা লাগাতে পারি।
৭ বছর বয়সী রোহান জানায়, আমিও আমার পিতাকে নৌকা তৈরির কাজে সহযোগিতা করি। স্কুল থেকে এসে আবার স্কুল বন্ধ থাকলে নৌকায় পাতাম লোহা লাগাই।
.png)
নৌকার কারিগর প্রতিবন্ধী হাফিজ জামাল (৩০) জানান, আমি ৫ বছর বয়স থেকে নৌকা তৈরি করে আসছি। আমার বাবাও এই কাজ করতেন। দুই পা না থাকায় হাত দিয়ে সব কাজ করতে হয়। ২ জন কারিগর মিলে সপ্তাহে ৩টা নৌকা তৈরি করা যায়। এতে মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা পাইকাররা নৌকা কিনে নিয়ে বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করেন।
নৌকা ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, সেরমস্তপুর গ্রাম থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১৫টি নৌকা কিনে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করি। প্রতিটি নৌকায় ৭০০ থেকে একহাজার টাকা লাভ হয়। ১৫ বছর ধরে নৌকা কেনা—বেচা করি।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার নৌকার দাম অনেক বেশি। যে নৌকা গত বছর ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় কিনতে পারতাম সেই নৌকা এবার ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকীন নূর বলেন, এই সেরমস্তপুর গ্রামটি নৌকা তৈরির গ্রাম হিসাবে পরিচিত। এই গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার নৌকা তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন। এই গ্রামের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল ধরণের সহযোগিতা করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন