হাতে-বেতে জীবন গাথা

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট, ২০২৫ ২২:২৫

তীব্র গরমে অস্থির হয়ে একটু শান্তির পরশ পেতে শীতল পাটির বিকল্প নেই। এ কারণে শীতল পাটি বিক্রি বর্তমান মৌসুমে যেমন বেড়েছে, তেমনই পাটিকরদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। জামালগঞ্জের শীতল পাটির কদর রয়েছে সারা দেশে। তাই এই উপজেলার ৭টি গ্রামে ৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে ৯—১০ বছরের শিশুরাও নিপুণ কারুকাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। 

 


পাটি শিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর ধরে জামালগঞ্জের শীতল পাটি ব্যাপক সমাদৃত। এখানকার চিকন বেতের শীতল পাটি চাহিদা প্রচুর। পাটি শিল্প বাংলাদেশের লোকাচারে জীবন ঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যের অলৌকিক উপাদান। গরমে রৌদ্রের তাপে এই পাটি গরম না হওয়ায় এই পাটিকে শীতল পাটি বলা হয়। মোর্তা নামের এক ধরণের উদ্ভিদের কাণ্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পাকনা মোর্তা গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তার পর বেতি তোলা হয়। এর পর ভাতের মাড় ও পানি দিয়ে জাল দেওয়া হয়। যার ফলে বেতি হয়ে উঠে মসৃণ ও সাদা। বেতীর উপরের খোলস থেকে শীতল পাটি তৈরি করা হয় এবং পরের অংশ সাধারন পাটি তৈরি করা হয়। বর্তমানে জামালগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ৭টি গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবার এই শিল্পের সাথে জড়িত। জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের কদমতলী, সোনাপুর, দূর্গাপুর, চানপুর গ্রামে রয়েছে প্রায় ২০০ পরিবার। ভীমখালী ইউনিয়নের কালিপুর এবং বেহেলী ইউনিয়নে বদরপুর ইনাতনগর গ্রামে রয়েছে প্রায় ৫০টি পরিবার। এরা সবাই পাটি বুলে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু কাজে গড়া শীতল পাটির জন্য এসব গ্রামগুলোকে পাটি শিল্পীর গ্রাম বলা হয়। সম্প্রতি শীতল পাটির গ্রাম হিসাবে সমাদৃত কদমতলী পরিবেশবাদী গ্রাম হিসাবে উপজেলায় স্বীকৃতি লাভ করেছে। এসব গ্রামগুলাতে শীতল পাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরণের পাটি তৈরি করা হয়। দুই ধরণের পদ্ধতিতে শিল্পীরা পাটি বুনন করেন। গ্রামে পাটির জমিনে জো—তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা করা হয়। আবার পাটির জমিন তৈরি হলে তার চতুর্দিকে অন্য রংয়ের বেতি দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়।

 


পরিবারিক ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম উপজেলার পাটি শিল্পীরা পাটি তৈরি করছেন। নারী পাটি শিল্পীদের সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় পাটি তৈরির কদর রয়েছে সর্বত্র। একটি পাটি বুনতে ৩ জনের ৩ দিন সময় লাগে। যা বিক্রি করা হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। পাইকাররা পাটি কিনে নিয়ে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভ করে বাজারে পাটি বিক্রি করেন। 

 


জানা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে মোর্তা কিনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এই জন্য শিল্পীরা বিভিন্ন এনজিও এবং মহাজনের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে পাটি শিল্পীরা ধরে রাখলেও অর্থনৈতিকভাবে দিন দিন জীবন যাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং নিজ এলাকায় মোর্তা চাষ না হওয়ার কারণে শিল্পীরা বিভিন্ন দাদন ব্যবসায়ী ও সুদখোর মহাজনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।

 


সোনাপুর মহিলা কুটির শিল্পী সমিতির সভাপতি মুক্তা রানী নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক হেপী রানী কর বলেন, আমাদের শীতল পাটি দেশের বিভিন্ন মেলায় কিংবা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের অন্য কোন উপার্জন নেই। শুধু শীতল পাটি বিক্রি করেই সংসারের ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাই। শীত ও বর্ষায় আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। সরকার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ দিলে একসাথে বিভিন্ন এলাকা থেকে মোর্তা কিনে এনে শীতল পাটি তৈরি করা যেত।

 


শিক্ষার্থী তৃপ্তী কর, মনিকা রানী কর জানায়, তাদের পরিবারের সবাই পাটি বুনতে পারে। মা—বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি তারাও পাটি তৈরি করেন, যার কারণে বাবা—মায়েরাও খুবই খুশি।
দুর্গাপুর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মহিলা সমিতির সভাপতি সবিতা রানী কর বলেন, সরকার এই উপজেলার ৭টি গ্রামের পাটি শিল্পীদের যে কোন ব্যাংক থেকে সরকারি বাৎসরিক কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এবং আমাদের গ্রামের পাশে প্রচুর সরকারি পতিত জমিতে মোর্তা করার জন্য বন্দোবস্ত দিলে আমরা উপকৃত হতাম। নতুবা এই পাটি শিল্প একসময় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই প্রায় শতাধিক পরিবার অন্য পেশায় চলে গেছে।

 


এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকীন নূর জানান, সরকারি ভাবে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে কিছু মহিলাকে ১৮ হাজার টাকা করে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে পাটি শিল্পীদের সহায়তা করার চেষ্টা করবো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার