প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৫ ২২:২৮
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান আইনে উল্লেখ রয়েছে ‘দেখার হাওর পাড়ে’। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের আগে সুনামগঞ্জ হলেও শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনের হাওরে ইতোপূর্বে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সমীক্ষার কাজ হয়েছে। যা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল। দায়িত্বশীলরা বলছেন, হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় হলে ক্ষতির মুখে পড়বে পরিবেশ—প্রতিবেশ। কমবে ফসল ও মাছের উৎপাদন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বললেন, এটি বিগত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
বিশাল দেখার হাওরের পাড়ে দোয়ারাবাজার, ছাতক, সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃত অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চলে সরকারি খাস জমি ধানী বা ফসলি জমি ছাড়াও শত শত একর পতিত এলাকা আছে। কিন্তু শান্তিগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়নের উজানীগাঁওয়ের বিপরীত দিকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সমীক্ষার কাজ করা হয়েছে। অথচ এটি গভীর হাওর এলাকা। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি জমি ও উঁচু পতিত ভূমি রেখে কেন হাওরেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হবে?
পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও দায়িত্বশীলরা বলছেন, হাওর ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলে কৃষি, মাছ ও হাওরের পরিবেশ প্রতিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। হাওরের বাস্তুতন্ত্র সংকটে পড়বে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি একেএম আবু নাসার বললেন, হাওরের জায়গা ভরাট করে কোনো প্রতিষ্ঠান হলে সেটির ক্ষতির দিক রয়েছে। যে জায়গায় মাটি ভরাট করবে, সে জায়গার ক্ষতিসহ যেখান থেকে মাটি আনা হবে, সেখানকারও ক্ষতি হবে। এজন্য উঁচু জায়গা দেখে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত স্থান নির্ধারন করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামী’র সুনামগঞ্জ জেলা শাখার নায়েবে আমীর অ্যাড. মুহাম্মদ শামসউদদীন আহমদ বললেন, সুনামগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় হবে এটি আমাদের জন্য সুখবর। কিন্তু বিগত সরকারের সাবেক মন্ত্রী এমএ মান্নান তিনি নিজের ইউনিয়নে জমি নির্বাচন করেছেন। হাওরের নিচু জমিতে তিনি চেষ্টা করেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য। এখনও এই জমি অধিগ্রহণ হয় নি। প্রাকৃতিক জলাধারকে নষ্ট করে এ ধরনের কাজ করা যাবে না।
সুনামগঞ্জ সিপিবি’র সাবেক সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বললেন, মানুষ যাকে উন্নয়ন বলে, সেই সকল কিছু নিজের ইউনিয়নে নিয়ে গেছেন একজন ব্যক্তি। একটি এলাকাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের উন্নয়ন হবে না। সুষম উন্নয়ন না হলে, কারও কারও জন্য ভোগান্তির কারণে হবে। সুনামগঞ্জে একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় প্রচুর উঁচু খাস জমি রয়েছে। যেখানে বিশ^বিদ্যালয় হলে পরিবেশ—প্রতিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। সরকারকেও জমির জন্য বড় অংকের মূল্য পরিশোধ করতে হবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় বললেন, সারাদেশে বিগত সময়ে আমরা উন্নয়নের কথা শুনেছি, সেটি কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর লাভের বিষয়। সুনামগঞ্জে যে ঘটনা ঘটেছে এর বাইরে নয়। নিজেদের মতো করে, নিজের ও গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে নতুন বাংলাদেশে কোনো উন্নয়ন কাজ হবে না। সুনামগঞ্জ শহর অনেক পুরাতন হলেও এর অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে লম্বা সময় ধরে। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত যে জমি বলা বা প্রচার করা হচ্ছে, সেটি সাবেক মন্ত্রী এমএ মান্নানের নিজের ইউনিয়নে। সেটি একটি হাওর শ্রেণির ভূমি। হাওর আমাদের জীব—বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সে জায়গা নষ্ট করে বিশ^বিদ্যালয়ের মতো স্থাপনা নয়, বরং এটি কোনো উঁচু জায়গায় করতে হবে।
দেখার হাওরের পরিবর্তে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উঁচু সরকারি খাস জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে নানা কর্মসূচি করছে সুবিপ্রবি স্থায়ী ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন আন্দোলন নামের সংগঠন। সংগঠনের দায়িত্বশীলরা বলছেন, সুনামগঞ্জের সকল উন্নয়ন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের নিজ ইউনিয়ন জয়কলস কেন্দ্রীক হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় তিনি হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রাথমিক কিছু কাজ করেছেন। এ নিয়ে তৎকালীন সময়েও রাজপথে সোচ্চার ছিলেন জেলার বাসিন্দারা। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষ এখন আরও বেশি সোচ্চার হয়েছেন।
সুবিপ্রবি’র স্থায়ী ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুনাজ্জির হোসেন সুজন বললেন, সোমবার (১১ আগস্ট’২০২৫ তারিখে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উন্নয়ন সভা হয়েছে। সভায় অনলাইনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি, ডিরেক্টর, নির্বাহী প্রকৌশলী ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন বলে জেনেছি আমরা। আমাদের কাছে সংবাদ আছে, ওই বৈঠকে শান্তিগঞ্জের উজানীগাঁওয়ের সামনের হাওরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত ভূমি বিবেচনা করে অবকাঠামো উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা হয়েছে। দুটি গেইট (যা উজানীগাঁওয়ের সীমানায় পড়ে, সাবেক মন্ত্রী এমএ মান্নানের বাড়ির কাছাকাছি) অথচ. এটি গভীর হাওর, ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি এবং ফসলি জমি। সুনামগঞ্জ—সিলেট একমুখী সড়কের লাগোয়া এর অবস্থান। পরিবেশ—প্রতিবেশের উপর আক্রমণসহ সুনামগঞ্জবাসী নানা ভাবে এখানে স্থাপনা হলে ভোগান্তিতে পড়বেন বিবেচনায়, আমরা এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে আন্দোলনে আছি। জেলাবাসী আমাদের দাবির প্রতি ঐক্যমত পোষণ করছেন। আগের সরকারের সময় কোন অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত হলেই, আমাদের সেটি মেনে নিতে হবে কেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সর্বস্তরের সকল এলাকার মানুষের ট্যাক্সের টাকায় উন্নয়ন হয়, সরকারের মন্ত্রী—উপদেষ্টারা জনগণের মালিক নয়, সেবক। এসব পদে থেকে কেউ অন্যায় করলে, আমাদের মানতে হবে কেন। বিগত ১৭ বছরে সুনামগঞ্জের কোনো উন্নয়ন হয় নি। হয়েছে শান্তিগঞ্জের একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন, সেটি এমএ মান্নানের ইউনিয়ন। সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ করা হয়েছে সুনামগঞ্জ সদরের শেষ সীমানায়। যেখান থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদে যেতে সময় লাগে ৫ মিনিট। সুনামগঞ্জ শহর থেকে যেতে হয় ২০ মিনিটে। এরই ধারাবাহিকতায় সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় উনার নিজ ইউনিয়নে করার প্রক্রিয়া করে রেখেছেন তিনি। আমরা সুনামগঞ্জবাসীকে নিয়ে তা হতে দেব না।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (উপাচার্য) প্রফেসর ড. মো. নিজাম উদ্দিন বললেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়েছে। তখন শেষ না হওয়ায় আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ মাস সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুনে সমীক্ষার কাজ শেষ করা হয়েছে। প্রথমে ১২৫ একর জায়গায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। এর ভেতরে কোথায় রাস্তা হবে, পুকুর, ভবন হবে এগুলো যাচাই করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে এই প্রতিবেদন পাঠানোর পরে বলেছে জায়গা কমাতে হবে। পরে আবারও ৭৫ একর জায়গায় নতুন করে সমীক্ষা করা হয়েছে, যা শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় পড়েছে।
হাওরের নিচু জায়গায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমি একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করি, জমির বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত, অনেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলে আবারও কাজ করা হবে। এখানে আমার কোনো চাওয়া পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বিশ^বিদ্যালয় আইনে সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের কথা বলা হয়েছে, কোনো নিদিষ্ট এলাকার কথা উল্লেখ নেই, কিভাবে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আগের প্রশাসন ১২৫ একের জায়গা নির্ধারণ করে সয়েল টেস্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় কার্যক্রম করেছে। এখানে আমার কিছুই করণিয় নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মো. সাইদুর রহমানের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান নি।
সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সম্প্রতি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকে এই প্রসঙ্গে বলেন, এক সময় শান্তিগঞ্জ সুনামগঞ্জ মিলিয়ে এক শহর হয়ে যাবে। যারা আন্দোলন করেন তারা বলতে পারবেন সুনামগঞ্জ শহরে একটা ইট লাগিয়েছেন। সরকারি মাল সরকার কেটে নিয়ে গেলে কিছু করার আছে, আমার তালুকদারি এটা? কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম আমি শান্তিগঞ্জ দেইনি, সবগুলো সুনামগঞ্জের নামেই হয়েছে। কারণ এটি আমার জেলা।
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জ শহরের সুশীল সমাজের লোকেরা, যারা নানা ধরণের পেশায় রয়েছেন, তারা শিক্ষিত সমাজের মানুষ, শহরে বাস করেন। তারা গ্রামে কিছু হতে দিতে চায় না। আমি গ্রামের মানুষ, আমার ঘরবাড়ি সুনামগঞ্জ শহরে নেই, এজন্য তারা আমাকে অবহেলা করে। তবে আমি সুনামগঞ্জের জন্য কাজ করেছি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন