প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৫ ২২:৪৩
যাদুকাটা নদীতে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজারের তাণ্ডব
ইজারা পদ্ধতির আড়ালে রূপের নদী যাদুকাটায় বিগত সরকারের আমলে হয়েছে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ। সনাতনী পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা বলা হলেও ড্রেজার এবং সেইভ মেশিনের তান্ডবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে নদীর দুই পাড়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও এমন অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয় নি। পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, ইজারার নামে ধ্বংসযজ্ঞে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ সমীক্ষা করা প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের লুটপাট থামানো যাবে না। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের রূপ সৌন্দর্যে্যর এই লীলাভূমির অবস্থাও সিলেটের সাদা পাথরের মতোই হবে।
জেলার সর্ববৃহৎ বালুমহাল এটি। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই মহালের ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে ইজারা পদ্ধতি পুনরায় চালু করার দাবিতে শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে কেউ কেউ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।
বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর ৪ ধারার খ— তে বলা হয়েছে, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা হয় অথবা আবাসিক এলাকা থেকে সর্বনিম্ন ১ কিলোমিটার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সীমানায় বালু বা মাটি তোলা যাবে না। একই ধারার গ— তে বলা হয়েছে, বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের কারণে কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হলেও বালু বা মাটি তুলা যাবে না। ছ— তে বলা হয়েছে, নদীর ভূ—প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণি, ফসলি জমি বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হয় বা হবার আশংকা থাকে তাহলে বালু বা মাটি তুলা যাবে না।
(1).png)
একই আইনের ৫ ধারার ১ এ বলা হয়েছে, পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ—গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না।
এই আইনের ১৫ ধারায় এমন অপরাধমূলক কাজের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই ধারার ১— এ বলা হয়েছে, ধারা ৪ ও ৫ এ বর্ণিত বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিধানসহ অন্য কোন বিধান কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অমান্য করলে বা এই আইন বা অন্য কোন বিধান লংঘন করে অথবা বালু বা মাটি উত্তোলনের জন্য বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলন করলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গকে বা তাদের সহায়তাকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদন্ড বা সর্বনিম্ন পঞ্চাশ হাজার টাকা হতে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এই কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালু বা মাটিবাহী যানবাহন বা সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে।
আওয়ামী সরকারের সময়ে হওয়া ইজারা নীতিমালায় ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে বালু তোলার কথা নিষেধ করা হয়েছে। শ্রমিকরা বারকি নৌকা বেলচা ব্যবহার করে সনাতনী পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নদীতে ড্রেজার, সেইভ মেশিনের তাণ্ডব হয়েছে বিগত সময়ে। জাদুকাটা ১ ও ২ বালু মহালের বাইরেও এমন পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দানবাকৃতির মেশিনের মাধ্যমে খুবলে নেওয়া হয়েছে নদীরপাড়। এতে বিলীন হয়েছে নদী তীরবর্তী রাস্তাঘাট, মানুষের ঘরবাড়ি ও সরকারি খাস জমি। নদীর পাড়ে থাকা দেশের উত্তর—পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ মন্দির শ্রী অদ্বৈত মন্দিরের (যেখানে সরকার ২০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করছে) দুই—তিনশ গজের মধ্যেই চলেছে ড্রেজার মেশিন। শাহ্ আরেফিন—শ্রী অদ্বৈত সেতু’র (১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে যেখানে সেতুর কাজ হচ্ছে) পিলারের কাছাকাছি এলাকায়ও ড্রেজারের তাণ্ডব হয়েছে। ওখানকার নদীরপাড় ভাঙতে ভাঙতে এসব প্রতিষ্ঠান হুমকিতে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাড. মল্লিক মইনুদ্দিন সোহেল বললেন, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’এর সঠিক প্রয়োগ আমরা দেখি না। সিমাবদ্ধতাগুলো দূর করে এই আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে এধরণের অপরাধের প্রবণতা কমবে। সম্প্রতি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে ওই এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন জমা দেবার জন্য পিবিআইয়ের সিলেটের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এই প্রতিবেদন জমা দিলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে বলে মনে করছি আমি।
পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, নদীর ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করা প্রয়োজন। এই অপরাধের সঙ্গে প্রভাবশালী বালু—পাথর খেকো থেকে শুরু করে প্রশাসনের যাদের সম্পৃক্ততা ছিলো তাদের নাম প্রকাশ্যে আনা হোক। প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে অন্যরা এধরণের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। এই নদীতে বিগত সময়ে দিনে—রাতে শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার উৎসব হয়েছে। এখন ড্রেজার চলে রাতে।
বাদাঘাটের বাসিন্দা সমাজকর্মী আবুল হোসেন বললেন, ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ইজারাদার নির্ধারণ করে প্রশাসন। ইজারার পরেও প্রশাসন দেখভাল করেন। তবুও কিভাবে ড্রেজার, সেইভ মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হয়েছে? নদীর পাড় কাটা হয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, নদী একটি জীবন্ত স্বত্তা। দেশের মাফিয়া অর্থনীতি ও দুবৃর্ত্তায়নের রাজনীতির যৌথ সমন্বয়ে যাদুকাটা নদীতে লুটপাট চালিয়ে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটানো হয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় দেখা যাদুকাটা নদী আর এখনকার যাদুকাটা নদী এক নয়। এখন প্রস্থে অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন যে নদী হয়েছে, আসলেই কী এটি এতো বড় নদী? ম্যাপ আছে, এসএ রেকর্ড রয়েছে। এগুলো ধরে পরিমাপ করলে মূল নদী বের হয়ে যাবে। তখন প্রকাশ্য হবে, তাহলে এতো বড় নদী হলো কিভাবে? কেউ না কেউ এর সঙ্গে জড়িত। তাদের নাম, পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হোক। নদীর পাড়ের বাসিন্দা সকলেই জানেন ইজারাদাররা শত শত ড্রেজার চালিয়ে দিনে রাতে বালু তুলতো। এখন স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ড্রেজার চলে রাতে বলে গ্রামবাসীরা জানান।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বললেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগের দৌরাত্ম্য আর নেই, এটি কনফিডেন্টলি বলতে পারি। এই কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতা করেছেন। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সুনামগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট একটি আদেশ দিয়েছেন। আমাদের পক্ষ থেকেও পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করা যায় কি না দেখবো। ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সমীক্ষা করবে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। এধরণের উদ্যোগ নেবো আমরা।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন