প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৫ ২২:৪৫
শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ক্রমশ বাড়ছে মোবাইল ভিত্তিক জুয়া খেলার প্রবণতা। এই জুয়ায় আসক্ত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকে ছাড়ছেন বসতবাড়ি। আবার কেউ কেউ এই জুয়াকেই নিচ্ছেন পেশা হিসেবে।
এতে সমাজের রন্ধে্র রন্ধে্র ছড়িয়ে পড়ছে জুয়া খেলার ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব। মারাত্মকভাবে ঘটছে নৈতিকতার স্খলন। মোবাইল অ্যাপস ভিত্তিক খেলা হওয়ায় সকলের সামনেই জুয়ারিরা সানন্দে খেলে যাচ্ছেন এই খেলা। উপজেলার বাজারগুলোতে রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, বাস—সিএনজি—লেগুনা স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে চলে জুয়া খেলার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ভয়ঙ্কর এই নেশা মোবাইল ভিত্তিক হওয়ায় প্রশাসনও সরাসরি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে যেতে বেগ পোহাতে হয়।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৮ ইউনিয়নে গুরুত্বপূর্ণ বাজার আছে ৮টি। ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে কিংবা দু’তিন গ্রামের সম্মিলনে আছে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি পয়েন্ট। এসব বাজার ও পয়েন্টগুলোতে উঠতি বয়সী কিশোর, তরুণ ও যুবকরা জড়িয়ে পড়ছেন অ্যাপস ভিত্তিক জুয়ায়। ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে, শুধু উঠতি বয়সী কিশোর, তরুণ কিংবা যুবকরাই নয় অনেক বৃদ্ধজনও জড়িয়ে পড়ছেন এতে। অনেকে সম্মানের পেশা বাদ দিয়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অনেকে করেছেন পেশার বদল। সূত্র জানিয়েছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় একাধিক মানুষ আছেন যাদের আগের পেশা ছিলো গাড়ি চালক, দোকানি বা অন্য কিছু। কিন্তু ইদানিং তারা ‘বেটিং অ্যাপস’—এর এজেন্ট এনে জুয়া খেলায় সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন মোটা অঙ্কের কমিশন। বাদ দিয়েছেন মূল পেশা। এজেন্টরা খেলতে আগ্রহী লোকদের কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণ করে বিনিময়ে তাদেরকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়া খেলার টাকা সাপ্লাই করে থাকেন। এই টাকা দিয়েই জুয়ায় অংশ নেন জুয়ারিরা। ১ টাকা থেকে শুরু করে সবোর্চ্চ টাকায়ও খেলতে পারেন তারা। তবে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ১৫ টাকা থেকেই শুরু করেন অনেকে।
সূত্র জানিয়েছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় সর্বাধিক ব্যবহার হচ্ছে 1XBet. শুধু শান্তিগঞ্জ উপজেলায় নয় বলতে গেলে সারা দেশে বহুল ব্যবহৃত এই অ্যাপটি। এই অ্যাপের মাধ্যমে তীর, ফুটবল, ক্রিকেট, ক্যারাম, লুডু, ভলিবল, বিমান, বিমল্পসহ আরো নানা ধরণের খেলায় বাজি ধরে থাকেন জুয়ারিরা। তবে শান্তিগঞ্জের বাজারগুলোতে জুয়ারিরা ‘শিলং তীর’ খেলায় আসক্ত বেশি। এই খেলাটি পরিচালনা হয় পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের শিলং রাজ্য থেকে। এছাড়াও 4Rabet, Mostbet, MelBet, 888Starz সহ আরো অনেক বেটিং অ্যাপে খেলে থাকেন তারা। এসব অ্যাপের বেশিরভাগই পরিচালিত হচ্ছে সাইপ্রাস, রাশিয়া, মাল্টা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে পরিচালিত হচ্ছে এজেন্টের মাধ্যমে। এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিংগুলোকে তাদের লেনদেনের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।
জানা যায়, উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের এক ব্যবসায়ী স্থানীয়ভাবে ‘মোটরলা’ মোবাইল নামে পরিচিত। তাকে সবাই মোটরলা বলেই চেনেন। সম্মানজনক পেশা ছেড়ে মোবাইল জুয়া আসক্ত হয়ে বসত বাড়ি ছেড়েছেন তিনি। বর্তমানে আছেন ঢাকায়। খুইয়েছেন প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকা। আরেক চালক সর্বস্ব হারিয়ে ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে স্বপরিবারে এখন রাজধানী ঢাকায় পলাতক। এরকম আরো অনেক গল্প আছে এই উপজেলায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জুয়ারি বলেছেন, উপজেলার বড় বড় বাজারগুলোতে বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে বেশিরভাগ জুয়ারিরা সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে বিকাল থেকে রাত ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত সক্রিয় থাকেন তারা। চায়ের দোকান বা অন্য কোনো দোকানে দেখা মিলে তাদের। ইদানিং পেশাদার মাদকসেবী ও মাদক কারবারীরাও এই জুয়ায় আসক্ত হচ্ছেন। তাদেরকে ধরে শাস্তির আওতায় আনতে পারলে কিছুটা কমে আসবে জুয়ার প্রবণতা। প্রথমে টার্গেট করতে হবে স্থানীয় এজেন্টদের। তারাই এই জুয়ার মূল হোতা। কীভাবে ধরা যাবে তাদের? এই পথও বাতলে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ছদ্মবেশে জুয়ারি সেজে প্রশাসনের লোকজন ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরতে হবে। না হলে কোনো অবস্থাতেই তাদের ধরা যাবে না। নিজে জুয়ারি হলেও এ পথ থেকে সরে আসতে চান তিনি। চান সর্বনাশা এই খেলা থেকে সবাই ফিরে আসুক।
স্থানীয়রা বলছেন, ভয়ঙ্কর একটি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি আমরা। এভাবে চলতে থাকলে জুয়ার প্রতি মানুষের আরো বেশি আকর্ষণ বাড়বে। সমাজে অপকর্মও বেড়ে যাবে। উঠতি বয়সীরা অপকর্মে জড়াবে। এখনই সময় এর একটি বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার। না হলে পরে এই অসামাজিক কাজটিকে কোনো অবস্থাতেই সামাল দেওয়া যাবে না।
আব্দুল্লাহ ফাউন্ডেশনের সিইও, কবি ও সংগঠক আজমল আহমদ বলেন, এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে তরুণরা এখন হুমকির মুখে। যে তারুণ্য বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে, সে তারুণ্য এভাবে অধঃপতনে যাবে সেটা মেনে নেওয়া যাবে না। জুয়ার যত সাইট বাংলাদেশে আছে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধ করা উচিত। এমনিতে আমরা নানামুখী সংকটের মধ্যদিয়ে সময় অতিবাহিত করছি। নতুন আরেকটি সংকট সৃষ্টি হওয়ার আগেই আধুনিক জুয়া থেকে তরুণদের বাঁচাতে হবে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। এটা আমাদের প্রাণের দাবিও।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি আবদুল আহাদ বলেন, নতুন এসেছি মাত্র। আমি বিষয়টি সম্পর্কে খুব একটা অবগত নই। তবে আমার অফিসারদের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেবো। তিনি বলেন, এ ধরনের অপারেশনে কৌশল করতে হয়। কখনো ‘সিভিল অপারেশনে’ যেতে হয়। সতর্কতার সাথে কৌশলে এ বিষয়ে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন