মাছ চাষে বাবা-ছেলের সাফল্য

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৫ ২২:৫২

মিশ্র প্রজাতির মাছ চাষ এবং বনজ ও ফলজ বাগানে সফল হয়েছেন ইসলাম উদ্দিন এবং তার ছেলে মাহমুদুল হাছান রাহি। রাহি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী। তিনি চাকরির জন্য চেষ্টা করেননি। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পৈত্রিক জমি কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মপ্রচেষ্টায় সফল হতে চেয়েছেন। রাহির পিতা ইসলাম উদ্দিনের চেষ্টায় ২০১৭ সালে বাড়ির পাশের ১৮ বিঘা ভূমিতে মাছ চাষ এবং বনজ ও ফলজ বাগান শুরু করেন, সহায়তা করেন ছেলে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাছান রাহি।

 


মাছ চাষ, বনজ ও ফলজসহ কক মোরগ এবং হাঁস লালন পালন করছেন নিয়মিত। দুইটি প্রজেক্টে গ্রামের একজন পাহারাদার সহ আরও তিনজনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পুঁজি কম থাকায় তার মেধা এবং অভিজ্ঞতাকে পরিপূর্ণ াবে কাজে লাগাতে পারেননি বলে জানান রাহি। ব্যাংক ঋণ পেলে তার পুকুর এবং বাগানে অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে জানান তিনি। 

 


জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের ইসলাম উদ্দিন এবং তার ছেলে মাহমুদুল হাছান রাহি। রাহি লেখাপড়ার পাশাপাশি মিশ্র প্রজাতির মাছ চাষ করছেন এবং বাড়ির পাশের গাছের যত্ন করছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে সফল তিনি। বাবা—ছেলের এই সফলতায় অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে স্থানীয় যুবকদের।


এলাকার লোকজন জানান, রাহি পড়াশুনা করে চাকরির জন্য চেষ্টা করেননি। তিনি ২০১৭ সালে ১৮ বিঘার মধ্যে বিশাল পুকুরে মাছ চাষ সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছও রোপণ শুরু করেন। শুরুতেই বেশ ভালো লাভ পেয়ে এটাকে পেশা হিসেবে নেন। এরপর থেমে থাকেননি। শুরুর দিকে রুই, কাতলা, মৃগেল, শরপুঁটি, শিং, পাঙ্গাস, সিলভার কার্পসহ মিশ্র মাছের চাষ করেই চমক দেখান তিনি। স্বাদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ যেসব দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে, এখন তিনি সেগুলোর চাষ করতে চান। এখন চলছে তারই প্রস্তুতি। 

 


রাহি বলেন, আমি এবার বছর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। পাশাপাশি আমার বাবার পুকুরে মাছ চাষ সহ বনজ ও ফলজ বাগানে সহায়তা করি। আমার ইচ্ছে আছে, একজন উদ্যোক্তা হবো। এখানে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। তিন—চার জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, আরও হবে আশা করি। 
আমি কোথাও কোনো প্রশিক্ষণ নেইনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজে থেকেই, মেধা, শ্রম দিয়ে  কাজ করছি। আমি মনে করি, প্রত্যক্ষভাবে কাজে মনোনিবেশ করলে অনেক বিষয়ে একটা ধারণা অর্জন করা যায়। আমি সেই ধারণা নিয়ে মাছ চাষ করছি। এরপরও যেখানে আমার সাহায্য বা পরামর্শ দরকার, সেখানে আমি আমার  এক বন্ধুর হেল্প নেই। 

 


তিনি বলেন, আমাকে সরকার যদি সহায়তা করে, তাহলে অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। আমার বাবার অনেক ভূমি রয়েছে। ইচ্ছে করলে গরুর খামার, মোরগের খামার দিতে পারি। ইতোমধ্যে আমাদের এই পুকুরে মাছ চাষ সহ অন্যান্য বনজ ও ফলজ চাষে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছি। সরকার থেকে ব্যাংক ঋণের সহায়তা পেলে আমার প্রজেক্ট আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব এবং এলাকার বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
রাহির পিতা ইসলাম উদ্দিন বলেন, আমি মাছ চাষে লাভবান হয়েছি। আমার এখানে আরও আশি শতক জায়গায় পুকুর খননের উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। আর্থিক সংকটের কারণে অগ্রসর হতে পারছি না। আমার এই মাছ চাষ সহ বনজ ও ফলজ চাষে আমার ছেলে এক বছর ধরে শ্রম দিচ্ছে। এই প্রজেক্টের আয় থেকে আমার ছেলে—মেয়েদের পড়াশুনা সহ পরিবারের সব খরচ চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও তিন—চারজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। আমার প্রজেক্ট বড় করার সুযোগ আছে। কারণ, আমার পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। প্রায় ১৮ বিঘা ভূমি আছে। যেখানে মাছ চাষের জন্য ৯ বিঘা এবং বাকি ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেছি। এরমধ্যে ফলজ চাষ থেকে প্রতি বছর  লেবু, পেয়ারা, আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, বড়ই  ইত্যাদি বিক্রি করছি, নিজেরাও খাই। 

 


এছাড়াও বনজ গাছ থেকে সেগুন, শিলকড়ই, কদমগাছ, বাঁশ ঝাড় আছে। এগুলো থেকেও বিক্রি করে আয় রুজি হয়। মাছের মধ্যে আছে, তেলাপিয়া, ব্রিগেড,সরপুঁটি, সিলভার, কার্পো, পাঙ্গাশ ইত্যাদি।
মির্জাপুর গ্রামের যুবক নাজমুল হক বলেন, অনেক বড় এরিয়া নিয়ে ইসলাম উদ্দিন চাচা এবং মাহমুদুল হাছান রাহি ভাই মাছ চাষ করেছেন। একইসাথে বিভিন্ন গাছ রোপণ করেছেন। লেবু, পেয়ারা, কলা সহ অনেক জাতের ফলের গাছও আছে। তারা এই কাজে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পেলে আরও বড় আকারে এই প্রজেক্টটা করতে পারবে।


মির্জাপুর গ্রামের মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় মাছ চাষ করায় আমরার সুবিধা হয়েছে। আমরা গ্রামবাসী এখান থেকে মাছ কিনে খেতে পারি। অনেক জায়গাজুড়ে পুকুরটি রয়েছে। মাছের সাইজ ভালো হয়। আমরা অনেকের উপকার হয়েছে।


মো. শাহাবউদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকায় সাত বছর ধরে পুকুরে মাছ চাষ করে লাভবান হয়েছেন ইসলাম উদ্দিন এবং উনার ছেলে। কিছু আর্থিক টানাপোড়েন আছে। সরকারি সহায়তা পেলে পুকুরটা আরও বড় করতে পারতো, আরও লাভবান হতে পারতো। এত এলাকার মানুষের উপকার হতো।

 


পাহারাদার মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমি মাছের খাদ্য দেই। দৈনন্দিন রাতে পাহারাদার হিসেবে কাজ করি। আমি এই কাজে থেকে আমার পরিবার পরিজন নিয়ে চলি।
জেলা বন বিভাগ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, বনজ ও ফলজ চাষে উদ্যোক্তাদেরকে আমরা স্বল্পমূল্যে চারা দিয়ে থাকি। জামালগঞ্জের মির্জাপুর গ্রামের ইসলাম উদ্দিন এবং তার ছেলে মাহমুদুল হাছান রাহির উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তারা যোগাযোগ করলে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে যেটুকু সহায়তা করার দরকার করবো।

 


জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, আমরা জানি না যে উপজেলায় এমন একজন মাছ চাষ সহ বনজ ও ফলজ চাষ করেছেন। আমাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করেননি। আমরা এমন উদ্যোক্তা চাই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে বলেন যদি ভালো উদ্যোক্তা থাকে, তাহলে বলবেন আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে— আমরা তাদেরকে ঋণ সহায়তা দেবো। উদ্যোক্তার যদি আমার সাথে যোগাযোগ করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা সহায়তা করবো।

 


জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শামশুল করিম বলেন, জামালগঞ্জের মৎস্য চাষী ইসলাম উদ্দিন এর বিষয়ে আমরা খোঁজ নেব। তাকে ব্যাংক ঋণে সহায়তায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে একটা প্রাক্কলন তৈরি করে পাঠাবো, যাতে তিনি সহায়তা পেতে পারেন। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সহায়তার প্রয়োজন আমরা করবো।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, হাঁস, মুরগি সহ গবাদিপশু লালনপালনের উদ্যোক্তাকে আমরা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে থাকি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে উৎসাহিত করি। এক্ষেত্রে জামালগঞ্জের মাহমুদুল হাছান রাহি এবং তার পিতা ইসলাম উদ্দিনকে যোগাযোগ করতে বলবেন, আমরা তাদেরকে যথাসাধ্য সহায়তা করবো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার