প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২২:৫০
বাড়ির চারপাশে বর্ষা ছয় মাস থৈ থৈ করে হাওরের পানি। পানির নিচে রয়েছে মাঠ—ঘাটসহ বাড়ির রাস্তা। চারপাশে পানি থাকার কারণে চলাচলের বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ে অসংখ্য পরিবার এখনো জনবিচ্ছিন্ন গ্রামে বসবাস করছে। পরিবারগুলো একা থাকায় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির তীব্র সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে।
টিউবওয়েল দূরে থাকার কারণে মানুষজনকে প্রায়শই দূষিত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। এতে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিবারগুলোতে বিদ্যুতের কোনো সুযোগ—সুবিধা নেই। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয়রা নিত্যদিন বিভিন্ন রোগবালাইয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। ছোট ছোট শিশুদের প্রতিদিন ডিঙি নৌকায় চড়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। শিশুরা সাঁতার জানলেও বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবল ে¯্রাত ও ঝুঁকির কারণে অনেক সময় অভিভাবকগণ সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে দ্বিধায় থাকেন। ফলে শিশুদের পড়াশোনায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। হাওরের এসব জনবিচ্ছিন্ন পরিবার আজো মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এক অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এসকল পরিবারের মানুষদের হাট—বাজারে যেতে হয় ছোট ডিঙি নৌকায় ভর করে। নৌকা দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভয়ের মধ্যে থাকে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা। পরিবারগুলোয় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহারের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
.jpg)
উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামের পাশে জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় ঘর বেঁধে বসবাস করছেন সাগর মিয়া ও তার স্ত্রী পপি বেগম। তারা জানান, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে অনেক বছর হলো এইখানে বসবাস করছেন। দুই মেয়ে উমেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। বড় মেয়ে সাঁতার জানলেও বাকি দুই সন্তান সাঁতার জানে না। তাদের নিয়ে চিন্তা থাকলে তারা ধীরে ধীরে সাঁতার শিখছে। অভাব—অনটন আর টাকার সংকটের কারণে ভালো জায়গায় ঘর তুলতে পারেননি। এই জায়গায় নিজেরা মাটি কেটে কষ্টে গড়ে তুলেছেন একটি কুঁড়েঘর। শুকনা মৌসুমে হাওরে ধান চাষ করে থাকলেও বর্ষার ছয়মাস পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস সাগর মিয়ার হাওরে ডিঙি নৌকা দিয়ে মাছ ধরা, তবে সব সময় মাছ না পাওয়ায় অভাব অনটন লেগেই থাকে।
পাঠাবুকা গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় মিয়া জানান, আমরা হাওরপাড়ের মানুষ ছয় মাস পানির সঙ্গে বসবাস করেই অভ্যস্ত। এই সময় ছোট ছোট শিশুরা ডিঙি নৌকায় করেই স্কুলে যায়। অল্প বয়সেই তারা সাঁতার শিখে ফেলে, তাই পানির ভয় তেমন কাজ করে না। তবে অসচেতনতার কারণে অনেক সময় ঘরে বা আশপাশে দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশুরা। ছয় মাস পানি থাকাকালীন আমরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি, আর শুকনা মৌসুমে হাওরে ধান চাষ করি। বৈশাখ মাসে জমি কেটে ধান ঘরে তুলি।
শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে বাজারে যেতে তাদের নৌকার উপরই ভরসা করতে হচ্ছে। পরিবারের ঘরটি সবার থেকে আলাদা হওয়ায় চারপাশে ছয় মাস হাওরের পানি জমে থাকে। ঘর থেকে বের হলেই চোখে পড়ে শুধু পানি আর পানি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব সময় চেষ্টা করি তাদের পাশে থাকার।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, গ্রামগুেলা জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে চারপাশে পানি থাকায় এসব পরিবার নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিবারগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন