প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২৩:৩৮
প্রাচীন ঐতিহ্যের সুরযন্ত্র বাঁশী নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ব্যাতিক্রমী এক প্রতিযোগিতা। সেরা বংশীবাদক অন্বেষণের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একাডেমি। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সিলেট বিভাগ সহ বাইরের জেলার ২০ জন বংশীবাদক। বংশীবাদকদের প্রতিভা তুলে ধরার এমন আয়োজন দেশের কোথাও আর আগে হয়নি বলে জানান প্রতিযোগীরা। দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে জাতীয়ভাবে এমন আয়োজনের দাবি অংশীজনদের। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে জায়েদ মাহমুদ, দ্বিতীয় দোয়ারাবাজারের প্রলয় দাস, তৃতীয় সুনামগঞ্জ শহরের সুস্মিতা সুভদ্রা।
তারুণ্যের উৎসবের অংশ হিসেবে বুধবার দিনব্যাপী সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে হাছনরাজা মিলনায়তনে এমন ভিন্নধর্মী আয়োজনের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। এসময় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সমর কুমার পাল। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক স্যার সুনামগঞ্জে আসার পর থেকেই সংস্কৃতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা করে তার সফল বাস্তবায়ন করছেন। এর আগে সেরা বাউল অন্বেষণও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো সেরা বংশীবাদক অন্বেষণ আয়োজন করা হয়েছে। এরকম আয়োজন সুনামগঞ্জকে সংস্কৃতি অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
.jpg)
প্রতিযোগিতার শুরুতেই মঞ্চ ভর্তি বংশীবাদক আপন মনে একসাথে বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানের সুরের ঝড় তুলেন বাঁশীতে। এরপর হাছনরাজা, দুর্বিণ শাহ সহ দেশের বিভিন্ন শিল্পীর সুর ও রাগ বাজান বংশীবাদকরা। প্রতিযোগিতায় সিলেট বিভাগের ৪ জেলা সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অংশ নেয় ২০ জন নারী—পুরুষ বংশীবাদক। নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার এমন ভিন্নধর্মী আয়োজনে অংশ নিয়ে উচ্ছাস ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রতিযোগিরা।
দোয়ারাবাজার থেকে আসা প্রলয় দাস বলেন, ২০ বছর ধরে বাঁশী বাজাই, কিন্তু বাঁশী বাজানোর প্রতিযোগিতা কোনদিন শুনিনি। এই প্রথম শুনলাম এবং অংশ নিলাম, এমন আয়োজনে আমরা অনেক খুশী।
সুনামগঞ্জ শহরের জায়েদ মাহমুদ বলেন, এরকম আয়োজন শুধু জেলায় না, আমরা চাই জেলা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হোক।
সুনামগঞ্জ শহরের তরুণ বংশীবাদক শিক্ষার্থী সুস্মিতা দে বলেন, প্রথমে শখের বশে নিজে নিজে বাঁশী বাজানো শিখেছি। পরে ওস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আমার মতো যারা বাঁশী বাজাতে চায়— তাদের জন্য শিল্পকলা একাডেমিতে প্রশিক্ষণ বিভাগ রাখা প্রয়োজন।
জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, জেলা প্রশাসক স্যারের উদ্যোগে এমন আয়োজন বিরল। আমি খোঁজে দেখেছি শুধুমাত্র বংশীবাদকদের নিয়ে দেশের কোথাও এমন আয়োজন হয়নি। যন্ত্রসংগীত নিয়ে জাতীয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা হয়। আমাদের দাবি এসব প্রতিযোগিতায় বাঁশীকে যেন যুক্ত করা হয়। বাঁশী আমাদের ঐতিহ্য, শাশ্বত সময় থেকে আমাদের শিল্পের সাথে একীভূত হয়ে আছে। সেই আশা থেকে আবার চাই বাঁশীর পুনর্জাগরণ হোক। বাঁশীর চর্চা আরো বাড়ুক। আমাদের চিন্তায় আছে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে বাঁশী প্রশিক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা করার।
.jpg)
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, বংশীবাদকের প্রতি আমার একটা ঈর্ষা আছে, আমি বাঁশী বাজাতে না পারার ঈর্ষা। আমি যদি বাঁশী বাজাতে পারতাম।
তিনি বলেন, শিক্ষাজীবনে হঠাৎ রাতে পড়ার সময় শুনতাম আমার বন্ধু বাঁশীতে সুর তুলতো ‘আমায় এতো রাতে কেন ডাক দিলি’। যখন বড় হলাম দেখলাম এতো ধরনের যন্ত্র বের হয়েছে সুরের, সেখানে বাঁশী যে একটা যন্ত্র এটা ভুলে যাচ্ছে সকলে। এর চর্চা কমে যাচ্ছে। তখন মনে হলো আমি দায়িত্বশীল কেউ হলে বাঁশীকে তুলে ধরার কাজ করবো। এই উদ্যোগ আমি ইউএনও থাকতে নিয়েছিলাম। সেখানে খুব একটা সাড়া আসেনি। আমি খাগড়াছড়ি থাকতে চেয়েছিলাম একটা গ্যালারি করে দিবো পাহাড়ে উঁচুতে। যেখানে মানুষ চাঁদ দেখবে আর বাঁশী শুনবে। যে বাঁশী বাজাবে তার বাঁশী শুনে অন্যরা টাকা দিবে— তার উপার্জন হবে। সেসময় করতে না পারলেও আজ সুনামগঞ্জে আমার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে।
সেরা বংশীবাদক অন্বেষই প্রতিযোগিতায় বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন উপমহাদেশের বিখ্যাত বংশীবাদক ও সুনামগঞ্জের সন্তান কুতুব উদ্দিন। আরও ছিলেন গবেষক সুভাষ উদ্দিন, অঞ্জন চৌধুরী, আলী আকবর, সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আশিকুর রহমান, আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল। প্রতিযোগিতা সঞ্চালনা করেন দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী। তবলা সহযোগী ছিলেন অমিত দে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন