প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২৩:৩৪
বুধবার সকালটা ছিল মেঘলা, সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত গাগলী গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হঁটে যাওয়ার সময় কানে ভেসে এল শিশুদের সমবেত কণ্ঠে ‘আমরা করবো জয়, নিশ্চয়’ গান। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম গাগলী। চারপাশে পুকুর আর জলাশয়ে ভরা এলাকা। বর্ষাকালে এখানকার শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি খুব বেশি। সেই গ্রামের মধ্যেই একরকম নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গাগলী শিশুযত্ন কেন্দ্র’।
বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় হাওর জেলা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, শান্তিগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় ‘সমন্বিত সমাজভিত্তিক শিশু যত্ন, সুরক্ষা এবং জীবন রক্ষাকারী সাঁতার শিখন কেন্দ্র—আইসিবিসি’ বিশেষ প্রকল্পে ২০২৪ সালের ফ্রেব্রুয়ারি থেকে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তিনটি উপজেলায় ৫০টি জীবন রক্ষাকারী সাঁতার শিখন কেন্দ্র ও এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য আরও পাঁচশ শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন করে শিশুদের দক্ষতার লক্ষ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রতিটি যত্ন কেন্দ্রে দুইজন ‘কেয়ার গিভার’ মায়ের স্নেহে শিশুদের যত্ন করছেন। তাদেরকে ছড়া, গল্প শেখানোর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে শৃঙ্খলার শপথ। শিখানো হচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও হাত ধোয়াসহ প্রায়োগিক নানা দক্ষতা বিষয়ক কাজ। কিভাবে আগুন লাগলে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে সেটাও অভিনয়ের মাধ্যমে শিখিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা।
গাগলী শিশুযত্ন কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর যেন জানিয়ে দিচ্ছিল, এ গ্রামে শৈশব আর শুধু ঝুঁকির নাম নয়, নিরাপত্তা এবং স্বপ্নেরও নাম। এই গ্রামের চারদিকে জলাশয়ে ঘেরা। বর্ষায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা এখানে নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় গ্রামটি কেঁপে উঠেছিল যখন পাঁচ বছরের চাচাতো ভাই—বোন মারিয়া ও সায়েম খেলতে খেলতে হারিয়ে যায়। সন্ধান করতে গিয়ে পাশের ডুবায় পাওয়া যায় তাদের নিথর দেহ। গ্রামজুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। কৃষক শাহিদুর রহমান আজও ভুলতে পারেন নি সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতির কথা।
শাহিদুর রহমান বলেন, মেয়ের কথা মনে হলে ভেতর ফেটে যায়। আমার বোনের ছেলে ও আমার মেয়ে খেলতে খেলতে কখন পানিতে পড়ে গেছে কেউ বলতে পারেনি। অনেকক্ষণ দেখতে না পেরে খুজতে খুজতে তাদের পুকুরে ভেসে থাকতে দেখি।
তিনি বলেন, এখন আমার এক সন্তান শিশু যত্ন কেন্দ্রে পাঠাই। ওখানে সে খেলাধুলা করে, অনেক কিছুই শিখে। সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত আমাদের কোনো চিন্তা থাকে না।
২০২৪ সালে শেষ করা ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে ৫১ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে। এর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। এই মৃত্যুগুলো কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনাই একেকটি পরিবারের জীবনের শোকগাথা।
.jpg)
শিশুদের পাঁচ ভুবন
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই গাগলী কেন্দ্রে ২৫ জন শিশু থাকে নিরাপদে। এখানে শুধু দেখাশোনাই হয় না, বরং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে থাকে নানা আয়োজন।
কেন্দ্রের সুপারভাইজার মৌসুমী তালুকদার বললেন, আমরা শিশুদের পাঁচটি ভুবনের মাধ্যমে শেখাই আপন ভুবন, গল্পের ভুবন, স্বপ্নের ভুবন, রঙিন ভুবন ও বাইরের ভুবন। এতে তারা খেলার ছলেই শিখে ফেলে। কেউ খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়লে ‘আপন ভুবন’—এ রাখা হয়।
এখানে প্রতিদিন খেলাধুলা, গান, ছড়া, গল্প বলা, আঁকাআঁকি, এমনকি সাঁতার শেখানোও হয়। যাতে শিশুরা শুধু আনন্দে সময় কাটায় না, বরং পানিতে নিরাপদ থাকতে শেখে। একজন যত্নকারী ও একজন সহকারী যত্নকারী প্রতিদিন শিশুদের দেখাশোনা করেন।
গ্রামের গৃহবধূ নাজমা বেগম বললেন, আমার চার বছরের মেয়ে মাইশাকে সকালে দিয়ে যাই। সে এখানে খেলাধুলা করে, নতুন নতুন ছড়া শিখে। বাসায় এসে আমাকে বলেও শেখায়। আগে আমি কাজের সময় সবসময় চিন্তায় থাকতাম, এখন আর সেই দুশ্চিন্তা নেই।
জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মন বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটছে। জেলার তিনটি উপজেলায় পাঁচশ’টি যত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও পঞ্চাশটি জীবন রক্ষাকারী সাঁতার কেন্দ্রের মাধ্যমেও পাঁচ বছর বয়সের উপরের শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন