মোড় যেন মরণ ফাঁদ

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৫ ২২:৩০

ছবি -সু.খবর

‘সরু সড়কে মাতাতিরিক্ত বাঁক— সড়ক হয়ে ওঠেছে মরণ ফাঁদ’ সুনামগঞ্জ—সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের শান্তিগঞ্জ অংশকে এভাবে মূল্যায়ন করেন নিয়মিত যাতায়াতকারীরা। এই উপজেলার সীমানায় থাকা তিনটি সড়কে (সুনামগঞ্জ—সিলেট, মদনপুর—দিরাই এবং ডাবর—জগন্নাথপুর) ২০ টি স্থানে বিপজ্জনক মোড় রয়েছে। এসব মোড়ে নিয়মিত ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। 


সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মোড়গুলো এমন যে, একপাশ থেকে অন্যপাশ একেবারেই দেখাই যায় না। একারণে ভয়ঙ্করভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ছয়মাস ধরে সড়কগুলোতে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে সড়কে থাকা মোড়গুলোকে কেন্দ্র করে। একেকটি মোড় একেবারে নব্বই ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গেছে। এক পাশ থেকে অন্য পাশের যানবাহন দেখা যাবে তো দূরের কথা হর্ন বাজালে তা—ও খুব একটা শোনা যায় না। আর রোডসাইন যা আছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বা বেশিরভাগ চালকরা খুব একটা বুঝেন না। বেশিরভাগ সাইনগুলো বনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অথবা দীর্ঘদিন তদারকির অভাবে মোচে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে। 


শুক্রবার বিকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিলেট—সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের জয়কলস ইউনিয়নের উজানীগাঁও গ্রামের সামনের বা নির্মাণাধীন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক)’র সামনের সড়কে আছে ভয়ঙ্কর মোড়। এ মোড়ে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও এই সড়কের শান্তিগঞ্জ উপজেলা অংশের জয়কলসের মোড়, সদরপুর মোড়, মদনপুর মোড়, পাগলা বাজার হাসপাতালের সামনের মোড় ও দামোধরতপী মোড়সহ আরো বেশ কিছু সড়ক মোড় বিপদের মোড় হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। 

 

দিরাই—মদনপুর ২৬ কিলোমিটার সড়কে শান্তিগঞ্জের পাথারিয়া পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। এতটুকু সড়কে ছোটবড় প্রায় ১৬টি মোড় রয়েছে। প্রতিবছর কোনো না কোনো মোড়ে সড়ক দুঘর্টনায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। সড়কের শুধুমাত্র নারাইনপুর এলাকায় রয়েছে বড় বড় চার মোড়, গাগলীতে দুটি, আছে বৌগলারখাড়া মোড়। নোয়াখালী বাজারে প্রবেশের আগে ভয়ঙ্কর মোড় রয়েছে। কাটাগাঙের সামনের মোড়, নগরের মোড়, গণিগঞ্জ সংলগ্ন মোড়, মহিলা মাদ্রাসা মোড়, দরগাহপুর মোড়, গাজীনগর মসজিদ মোড় ও লটকাইল ব্রিজ মোড় চালকদেরকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। এসব মোড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালাচ্ছেন চালকরা। এদিকে, পাগলা বাজার সংলগ্ন ডাবর পয়েন্ট থেকে জগন্নাথপুর সড়কের ভমবমি বাজার পর্যন্ত রয়েছে বড় বড় চার মোড়। সিচনী পয়েন্ট, দরগাপাশা (হাইস্কুলের সামনে), ছয়হারা মোড়গুলো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে সিচনী পয়েন্ট মোড়ে। ভমবমি বাজারের মোড়ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ক্রমাগত। এছাড়াও আলোচনায় আছে কচুরগাঁও পয়েন্ট সংলগ্ন মোড়। 


এসব মোড়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয় চালকদের। অদক্ষ ও কম বয়সী চালকদের কারণে মোড়গুলো দুর্ঘটনার ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্কও তৈরি করেছেন ছোট গাড়ি ও বড় গাড়ির চালকেরা। বড় গাড়ির চালক ও নেতারা বলছেন অদক্ষতা ও রোড সাইন না জানার কারণে দুর্ঘটনায় পড়ছে ছোট ছোট যানবাহনগুলো। রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত যান চালানো, মোড়ের মধ্যে হঠাৎ করে ওভারটেকিং করাসহ ইত্যাদি কারণে মোড়গুলোতে দুর্ঘটনা ঘটে। 
অন্যদিকে, ছোট গাড়ির চালকরা বলছেন, রাস্তায় চলাচল করা ছোট গাড়িগুলোকে গাড়ি হিসেবে গণ্যই করে না বড় গাড়ির চালকরা। গাড়ি চালানোর সময় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বড় গাড়ির চালকেরা। দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানও অনেকটা দুর্ঘটনার কারণ বলে মনে করেন সচেতন মহল। 

মোড়ে দুর্ঘটনা রোধে করণীয়:
দুর্ঘটনা রোধে তারা বলেন, দুর্ঘটনা রোধে এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাস্তায় থাকা মোড়গুলো কমিয়ে আনতে হবে। সড়ক সংস্কার করতে হবে। প্রশস্তকরণ করতে হবে। মোড়ে থাকা গাছগুলো কেটে অথবা ছেটে দিতে হবে। বড় বড় মোড়গুলোতে বড় বড় ‘লুকিং মিরর’ বসাতে হবে। এমনভাবে বসাতে হবে যেনো উভয় পাশ থেকে গাড়ি আসলে স্পষ্ট দেখা যায়। গাড়িগুলোকে বুঝাতে হবে মোড়ে মোড়ে গাড়ি চালানোর সময় সিগন্যাল মেনে নিজের সীমানায় থেকে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চালাতে হবে। মোড়ের রাস্তাগুলোতে নির্দিষ্ট গতিসীমা মানতে হবে। 
দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জ—সিলেট, দিরাই, জগন্নাথপুর সড়কে বাস চালান গোবিন্দগঞ্জের লিটন দাশ ও বলাউড়ার আল আমীন। তারা বলেন, রাস্তায় ছোট গাড়িগুলোর চালকরা বেশিরভাগই অদক্ষ। কোনো রকমের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামে, অনেকেরই লাইসেন্স থাকে না, বিআরটিএর অফিসের অনুমোদন থাকে না। প্রশিক্ষণের অভাবেও রাস্তায় থাকা সাইন বা সিগন্যালে ব্যপারেও তারা খুব একটা জানেন না বলেই মোড়ে অভারটেকিং করে—ঘটে দুর্ঘটনা। এরা হর্ণ ছাড়াই গাড়ি চালায়। টমটম বা ইজিবাইকগুলো আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আমরা চাই, যে গাড়ির যে রাস্তায় অনুমোদন আছে সে রাস্তাতেই থাকুক। আইনের কার্যকর ব্যবহার হোক। সবাই ট্রাফিক আইন মানুক। 

 

জয়কলস ইউনিয়নের আসামপুর গ্রামের সিএনজি চালক রবিউল ইসলাম ও পাগলা বাজারের সিএনজি চালক হেলাল মিয়া বললেন, আমরা ছোট গাড়ি চালাই। আমাদেরকে বড় বড় গাড়ির ড্রাইভাররা গাড়ি—ই মনে করে না। মোড়গুলোতে গাড়ি নিয়ে ঢুকলে তারা কোনো রকমের হর্ণ না দিয়েই  বেপরোয় চালায় এজন্য দুর্ঘটনা ঘটে। সিগন্যাল আর গাড়ির গতি কমিয়ে রাখলেই মোড়গুলোতে দুর্ঘটনা কমে আসবে। মোড়গুলোতে বড় বড় আয়না ব্যবহার করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। 

 

সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলা সদরে নিয়মিত যাতায়াত করেন ডা: সৈকত দাস। তিনি বললেন, ডাবর থেকে সুনামগঞ্জ শহর পর্যন্ত সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে থাকা বাঁক মরন ফাঁদে পরিণত হয়েছে। শুধু আইনের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। চালক, যাত্রী সাধারণকে সচেতন হতে হবে।


শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বললেন, দিন দিন এই সড়কটি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মোড়গুলো আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। জেলা সমন্বয় সভায় সড়ক ও জনপথের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেছি, অদূর ভবিষ্যতে বাঁকগুলো কমানোর চেষ্টা করতে হবে। এখন সাময়িকভাবে হলেও রাস্তার মোড়গুলোতে লুকিং মিরর বসাতে হবে। তাহলে উভয় পাশের গাড়ি চালকরা যানবাহন দেখতে পাবেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ্ বললেন, দুইলেনের সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। অনেক আগে করা সড়কের কিছু এলাকায় বাঁকও বেশি আছে। সড়ক প্রশস্তকরণের প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা আছে। প্রকল্প জমা দেবার নির্দেশনা পেলেই পাঠানো হবে। অনুমোদিত হলে প্রশস্তকরণ কাজ করার সময় বাঁক কমিয়ে আনা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার