প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ ২৩:৩৫
নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়
জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনার হাওরের বুকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিদ্যালয়টি ৫৫ বছর ধরে ১৯টি গ্রামে বছর পর বছর জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে। পাকনার হাওর উপজেলার সবচেয়ে বড় হাওর এবং পর্যটকদের পছন্দের এলাকা। চারিদিকে থৈ থৈ পানির মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিদ্যালয়টি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বিদ্যালয়টি যেন পানিতে ভাসছে। বিদ্যালয়ের চারিদিকে তাকালে দেখা যায় শুধু পানি আর পানি এবং হিজল করচ বাগান। চতুর্দিকে পানির মাধ্যেই দ্বীপের মতো জায়গায় বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌকা। দূর থেকে অনেকে এটিকে আশ্রয় কেন্দ্র মনে করলেও এটি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
বলছিলাম জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের অবস্থিত নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা। বিদ্যালয়টির একপাশে মাতারগাঁও ও অন্যপাশে খুজারগাঁও গ্রাম। শুকনা মৌসুমে পায়ে হেঁটে আর বর্ষায় নৌকায় যাতায়াত মাধ্যম হলেও বিদ্যালয়ে সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়টি দেখতে দৃষ্টিনন্দন, দূর থেকে যে কাউকে আকৃষ্ট করবে বিদ্যালয়। বছরের বেশির ভাগ সময় বিদ্যালয়টির চারিপাশে পানি থাকার কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করে থাকেন। প্রতি গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে নিয়ে আসা হয়। আবার ছুটির পর প্রতিটি শিক্ষার্থীকে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়। হেমন্তে পায়ে হেঁটে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসেন।
বিদ্যালয়ের পাশে হিজল করচ বাগ থাকায় প্রতিনিয়তই পর্যটকদের নৌকা বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থান করে। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজন বিদ্যালয়ের পাশে হিজল করচ বাগানে রাত্রি যাপন করেন। এখানে নিয়মিত চলছে পাঠদান। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হাজিরাও অন্য যেকোন বিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি।
জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা হলেও নিম্ন মাধ্যমিক স্বীকৃতি পায় ১৯৭৩ সালের ১০ আগস্ট। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায় ১৯৮৪ সালের ৬ জুলাই। নিম্ন মাধ্যমিক এমপিওভুক্ত হয় ১৯৮৬ সালের ১ ডিসেম্বর। মাধ্যমিক হিসাবে এমপিওভুক্ত হয় ১৯৮৭ সালের ১ জুন। হাওর ঘেঁষা প্রত্যন্ত জনপদে ১৯ টি গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে শিক্ষার নির্ভরযোগ্য বিদ্যাপীঠ। এখানে পুরানো একটি বিল্ডিং ও একটি ৪ তলা ভবন রয়েছে। ২০২০ সালে ঠিকাদার কাজ শুরু করলেও চোখে পড়ার মতো বিভিন্ন অনিয়ম থাকায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রধান শিক্ষক এখনো ঠিকাদারের কাছ থেকে ভবন বুঝে নেন নি। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় অসুবিধা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের চারপাশে রয়েছে হিজল করচের বাগান। শিক্ষার্থীরা ক্লাসের অবসরে বিদ্যালয়ের চারপাশে বসে গল্প করতে দেখা যায়। নিবিড় পাঠদানের জন্য এই বিদ্যালয়ে রয়েছে ১২ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক। বছর শেষে বিদ্যালয়ের ফলাফলও সন্তোষজনক। হাওরের এই বিদ্যালয়টিতে ১৯ টি গ্রামের ৫৫৪ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন।
নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত চন্দ্র সরকার জনান, বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার জন্য আরও কিছু নৌকার ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমে যেত। বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় অনেক সময় গবাদি পশু এসে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন গাছ-গাছালি নষ্ট করে ফেলে। বিদ্যালয়টিতে তেরানগর ব্রিজ পার হয়ে মাতারগাঁও হয়ে বিদ্যালয় পর্যন্ত এবং লালপুর, বিনাজুরা, দৌলতপুর, খুজারগাঁও হয়ে বিদ্যালয় পর্যন্ত একটি আবুরা রাস্তা করে দিলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অর্ধেকাংশে কমে যাবে। যাতায়াতের বিড়ম্বনার কারণে এবং ঝড় বৃষ্টি থাকলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। এসময় তিনি ৪র্থ তলা ভবনটি সংস্কার ও বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাম কুমার সাহা জানান, বিদ্যালয়টি লেখাপড়ার মান ভাল থাকলেও যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করতে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের ১৯টি গ্রামের একমাত্র বিদ্যাপীঠ নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়। আমি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে হাওরের বুকে এই বিদ্যালয়টির দুপাশে রাস্তা ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে দিন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন