প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৫ ২২:৩৭
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। এই সড়কে চলাচল করে দূরপাল্লার বাস, আঞ্চলিক বাস-মিনিবাস, সিএনজি, ট্রাক, লাইটেসসহ সবধরণের ছোটবড় যানবাহন। রাজধানী ঢাকাসহ সিলেটের সাথে সুনামগঞ্জ জেলার একমাত্র সড়কপথ হচ্ছে ব্যস্ততম এই সড়কটি। যত দিন যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে এখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে সড়ক দূর্ঘটনা। এসব ঘটনায় কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বরণ করছেন পঙ্গুত্ব, আবার কেউ কেউ বিদায় নিচ্ছেন চিরতরে। ইদানিং সড়কটি যেনো মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বিআরটিএ’র পরিসংখ্যান গত ৯ মাসে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে ৬০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধুমাত্র জানুয়ারী মাসে ১০টি দুর্ঘটনায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭জন। ফেব্রুয়ারীতে ১২ দুর্ঘটনায় ১০জন নিহত ও ২৮জন আহত হয়েছেন। মার্চ মাসে ৭টি দুর্ঘটনায় ৮ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৪ জন। এপ্রিলে ৬ জন, মে মাসে ২ জন নিহত হয়েছেন। জুন মাসে ৫টি দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। জুলাই, আগস্টে যথাক্রমে ৭ ও ৬ জন করে নিহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচটি দুর্ঘটনায় ৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যমতে, গতকাল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পরে মা-মেয়ে নিহতের ঘটনা ঘটে এই সড়কে। আহতদের অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন। বাকীরা ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বেগ পোহাচ্ছেন দিন রাত। দুর্ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে আৎকে উঠেন কেউ কেউ। অনেকের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার আক্তাপাড়া এলাকার ওমান ফেরত রেমিট্যান্স যোদ্ধা আলমগীর হোসেন এমনই একজন হতভাগ্য যুবক। আহত ও নিহতদের মধ্যে আছে সব বয়সী মানুষ।
এই সড়কেই কেনো এতো প্রাণহানি?
এই সড়কে কেনো এতো বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছেÑ এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, রাস্তার পাশে ইট, বালু, মাটি, গাছ ইত্যাদি রেখে ব্যস্ততম সরু সড়ককে আরো ছোট করে রাখা হয়। বেশি যানবাহন হওয়ায়, জনসংখ্যার পরিমাণ বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনার পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে কোনো ডিভাইডার নাই। এক পথেই যাওয়া আসা। এতে যানবাহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটার প্রবণতা থাকে বেশি। তাছাড়া দূর পাল্লার বাসে একজন মাত্র চালক সারা রাত গাড়ি চালান। এজন্য ছোট এই রাস্তায় ঘুমের সমস্যা থেকেও দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সরু রাস্তা, অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, পর্যাপ্ত ঘুম না ঘুমিয়ে দীর্ঘ পথ রাত জেগে এক টানা গাড়ি চালানো, নেশা দ্রব্য সেবন, অনুমোদনহীন গাড়ি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক, রাস্তায় ওভারটেকিং-এর ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা, অসচেতনভাবে রাস্তা পারাপার, পথচারী ও চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার, সড়ক সিগন্যাল না মানার কারণে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে এ সড়কে। এছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত ইজিবাইক, সিএনজির চলাচল, হিউম্যান হলার চলাচল, রাস্তায় অপরিকল্পিত পার্কিং, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কারণেও এই সড়কে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বড় বড় মোড় দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ এই সড়কে।
মখজ্জুল ইসলাম নামের একজন বলেন, পাগলা বাজারের কাছে মাত্র একমাস আগে দুর্ঘটনায় ৩ জন মানুষ ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। গতকাল আরো দু’জন। এ জায়গাটি ভয়ঙ্কর হয়ে আছে। এখানে গতিরোধক বসানো দরকার। না হলে আরো দুর্ঘটনা ঘটবে এ এলাকায়। এলাকাবাসীর দাবি, যতদ্রুত সম্ভব এখানে গতিরোধক বসানো হোক।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয়
দুর্ঘটনা প্রতরোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে এই প্রতিবেদকের কথা বলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহনেওয়াজ হাসনাত ই রাব্বী’র সাথে। তিনি বলেন, তখনই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে যখন আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিকভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়ে আসতে পারবো। বিআরটিএ ড্রাইভারদেরকে সঠিকভাবে লাইসেন্স দিবে, ফিটনেস দেখে চলাচলের উপযোগী গাড়িকে অনুমোদন দিলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমতে শুরু করবে। যেসব প্রতিষ্ঠান সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ বা সড়ক রক্ষার দায়িত্বে আছেন তারা দক্ষ ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সড়কের সংস্কার করলেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হবে। এতে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারগণ বেশি ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং পথচারীদের সচেতন থাকতে হবে। তারা কীভাবে রাস্তা পারাপার করতে চান তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করে নিরাপদ উপায়ে পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাস্তায় চলাচল ও ট্রাফিক আইন মানার ব্যপারে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। ট্রাফিক আইন মানতে হবে। না মানলে আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। বড় বড় মোড়গুলোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। না হলে লুকিং মিরর বসাতে হবে।
ড্রাইভিং-এর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভাঙাচোরা রাস্তা ঠিক করতে হবে। মহাসড়ক বা আঞ্চলিক মহাসড়কে গরু-ছাগলের বিচরণ বন্ধে স্থানীয় মানুষকে ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ছাড়াও যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে চালক, যাত্রী ও পথচারীতে সতর্ক থাকতে হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র সহ-সভাপতি ওবায়দুল হক মিলন বলেন, প্রথমত, বড় বাসগুলো দীর্ঘ রাস্তা এক চালকে চালানোয় চোখে ঘুম থেকে যায়। এ কারণে ভোর বেলাতে দূরপাল্লার বাসগুলো বেশি দুর্ঘটনায় পড়ছে। দুই জন চালক রাখার আইন করতে হবে। চালকদের অসচেতনাতার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে, আর লক্করঝক্কর যানবাহন তো আর আছেই। অথচ এসব প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেই বিআরটিএ অফিসে। অনুমোদনহীন অনেক যানবাহনের কারণেই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা, সিগন্যালবিহীন গাড়ি ও সড়ক, অবৈধ পার্কিং এবং বাসস্ট্যান্ডগুলো বেদখল হচ্ছে। এসব প্রতিকারে নিয়ে আসা দরকার। চালকদের প্রশিক্ষণ ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় শীর্ষক একটি কর্মসূচি হাতে নিতে একটি প্রস্তাব আমাদের কেন্দ্রিয় কমিটিতে পাঠাবো।
জয়কলস পুলিশ ফাঁড়ির ওসি সুমন কুমার চৌধুরী বলেন, এই সড়কে যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে আমরা তা চিহ্নিত করে কাজ করছি। রাস্তাটি এমনিতেই ছোট, আরো যারা রাস্তাটি ছোট করে রাস্তার পাশে মালামাল রাখেন আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। ত্রি-হুইলারের বিরুদ্ধে অভিযান করছি। এসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের অভিযান সার্বক্ষণিক অব্যাহত আছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন