প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ ২৩:২৯
পুলিশকে ‘লিমপিডের’ স্লিপ দেখিয়ে পগারপার
জেলার ধোপাজান-চলতী নদীর বালু লুট উৎসব থামানোর যেন কেউ নেই। প্রত্যেকদিন সরকারি কাজের টোকেনে ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে তোলা হচ্ছে ভিটবালুর বদলে সিলিকা বালু। রাতের দৃশ্য আরও ভয়ঙ্কর। ধোপাজান বালু মহাল থেকেই তোলা হচ্ছে উন্নতমানের সিলিকা বালু। দিনে প্রকাশ্যে বের হয় ড্রেজিংয়ের বালু আর রাতে সনাতন পদ্ধতিতে তোলা হয় উন্নতমানের দামী বালু। বিআইডব্লিউটি’র অনুমতি চুক্তি ভেঙে টোকেনের বিনিময়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন এসব বালু বিক্রয় করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিয়ারিং। অনুসন্ধানে মিলেছে বিক্রির প্রমাণও। যে টোকেন দিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাওয়ার কথা বালু। সেই টোকেন পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীদের কাছে। টোকেন দিয়ে আনা বালু কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এতে লাভবান হচ্ছে সরকারি প্রকল্পের কাজে বালু তোলার অনুমতি নেয়া লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। লুট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, রাজস্ব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার।
শনিবার সরেজমিনে ধোপাজান-চলতি নদীতে গিয়ে দেখা যায়, উরারকান্দা, রামপুর সহ নদীর দুই তীরের বিভিন্ন গ্রামের পাশে বাঁধা বালুভর্তি অন্তত ৫০টি বাল্কহেড। সবগুলো বাল্কহেডে বালু তোলা হয়েছে ধোপাজান বালুমহাল থেকে। সনাতন পদ্ধতিতে বালু তুলেছেন বারকি শ্রমিকরা। তবে এই বালু মহালের কোন ইজারা না থাকলেও প্রতি ফুটে ২০ টাকা হারে রয়েলটি আদায় করছে লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। রয়েলটি আদায় করে কোম্পানির পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে টোকেন। এই টোকেন দেখালেই ছেড়ে দেয় পুলিশ। প্রতিরাতেই বের হয় এসব নৌকা। শনিবার রাতে এসব বাল্কহেড টোকেন নিয়ে বের হওয়ার কথা থাকলেও এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে পড়ে। পুলিশ না আটকালেও শতাধিক বাল্কহেড আটকে দেয় গ্রামের বিক্ষুব্ধ মানুষজন। পরে সদর থানার সহযোগিতায় কিছু নৌকা আটক করে নিয়ে যায় নৌ পুলিশ।
চলতি নদীর পাড়ের রামপুর এলাকায় বাঁধা বাল্কহেডের শ্রমিক সেলিম উদ্দিন বললেন, আমরা কোম্পানিরে টাকা দিয়ে বালু তুলি। দিনে উপরের চড়া (নদীর চর) থেকে বারকি দিয়ে নৌকা লোড হয়। বিকেলে প্রতি ফুট বালু ২০ টাকা করে রয়েলটি নিয়ে টোকেন দিয়ে যায় কোম্পানির (লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং) লোকজন। রাতে বের হয়ে সুরমা নদী দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে বালু বিক্রয় করা হয়। বালু নিয়ে যাবার সময় পুলিশ আটকায় কি না জানতে চাইলে, কোম্পানির টোকেন থাকলে পুলিশ আটকায় না বলে জানালেন সেলিম।
আরেক শ্রমিক আক্তার হোসেন বললেন, ড্রেজার উঠানো বালুর চেয়ে হাতের যন্ত্রে তোলা বারকি নৌকায় নিয়ে যাওয়া বালুর দাম বেশি। আমরা ১৮ টাকা ফুটে বালু তুলাই। ২০ টাকা নেয় লিমপেড। আরও ৫-৬ টাকা যায় টোল ট্যাক্স দিতে হয়। আমরা অবশ্য ৬০-৭০ টাকায় প্রতি ফুট বিক্রয় করতে পারি। আজকে গ্রামবাসী ঝামেলা করতেছে, এজন্য এখন বের হচ্ছি না।’
রবিবার বিকেলে আক্তারকে আবার ফোন দিয়ে শনিবারের উত্তোলিত বালু কোথাও বিক্রয় করেছেন কী না, জানতে চাইলে- তিনি জানান, ‘রাতে নদীর মুখে বের হওয়ার সময় পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।’
টোকেনের বালু ক্রয় করে বিক্রি করা এক ব্যবসায়ীর সাথেও কথা হয় এই প্রতিবেদকের (ব্যবসায়ীর নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হলো না)। তিনি বললেন, নৌকায় করে বালু নিয়ে আসলে ৬০ টাকা ৭০ টাকা দরে বালু কেনা যায়। লিমপিডের টোকেনও দিয়ে যায় নৌকা ওয়ালারা। কখনো আবার দেয়ও না। তারা কিভাবে আনে সেটা আমি জানি না। আমাকে বালু দিচ্ছে আমি টাকা দিয়ে কিনে বিক্রয় করছি।
মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মমিনুল হক বলেন, প্রায় দেড়শত নৌকা গত শুক্রবারও রাতে আমরা গ্রামবাসী মিলে আটক করি। প্রশাসনকে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হয়েছে, পরের দিন শনিবারও জানানো হয়েছে। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নি। শনিবার রাতে সবগুলো নৌকা এক হয়ে আমাদের গ্রামের সামনে থেকে চলে যায়। পরে পূর্বসদরগর, অক্ষয়নগর ও ইব্রাহিমপুর গ্রামের মানুষ নৌকাগুলো আটকেছে। শুনেছি পুলিশ এসে কিছু নৌকা জব্দ করে নিয়ে গেছে। বাকিগুলো ছেড়ে দিয়েছে।
টুকেরবাজার নৌ-পুলিশের এসআই মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, আমরা ২১ টি নৌকা পেয়েছি। এরমধ্যে ১০ টি বালু ভর্তি নৌকা আনা হয়েছে। অন্যগুলো সদর থানা নিয়েছে। এগুলো ছেড়ে দেয়া হবে, তাদের লিমপিড কোম্পানির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা নদীর মুখে ২১ টি নৌকা পেয়েছি। সেগুলো নিয়ে এসেছি। ভেতরে আরও থাকতে পারে। সে বিষয়ে জানি না।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. আবুল কালাম বললেন, নদীতে সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছি। অবৈধভাবে বালু পাথর উত্তোলন করতে দেবো না। নদীতে কোনো খালি নৌকাও রাখবো না। সব নৌকা বের করে দেবো।
রোববার সন্ধ্যা সাতটায় অনেক চেষ্টার পর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লিমপেড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জিএম রাশেদুল হাসান ফোন ধরলে প্রশ্ন ছিল ‘আপনারাতো ভাই ভিট বালু ঢাকা সিলেট মহাসড়কে নেবার অনুমতি এনেছেন কাগজে দেখেছি। বালু বিক্রয়ের বা নদীতে রয়েলিটি তোলার কোন অনুমতি আছে কী না একটু বলবেন কী, কিংবা কোন কাগজ থাকলে দেয়া যাবে কী।’ উত্তর না দিয়ে তিনি বললেন, একটু অপেক্ষা করুন- আপনাকে ফোন দিচ্ছি আমি। এরপর কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করলেন না।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি বিআইডাব্লিউটিএর সিলেট আঞ্চলিক দপ্তরের উপপরিচালক মো. শরীফুল ইসলাম। তবে এর আগে গত ২০ অক্টোবর মাটির সাথে বালু উত্তোলনের কথা অস্বীকার তিনি করে বলেন, খনিজ সম্পদ বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গার বাইরে থেকে শুধু ভিট মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। আমি নিয়মিত পরিদর্শন করছি। আপনি যদি সরেজমিনে গিয়ে ব্যত্যয় পান রিপোর্ট করেন।
প্রসঙ্গত, মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা ডলুরা চলতি নদীর প্রবেশ মুখেই জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা আর পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘবছর বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হয় হরিলুট। লুট বন্ধ না করে উল্টো বিভিন্ন অভিযোগে প্রত্যাহার হন তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেন। এরপর প্রশাসন তৎপর হলে ফের বন্ধ হয় বালু উত্তোলন।
তবে বালুমহালে উত্তোলন বন্ধ থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে কয়েকদিন ধরে নদীতে চলছে বালু উত্তোলন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র এক কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এরপর থেকেই নদীর একাধিক স্থানে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার আর বোমা মেশিনের তাণ্ডব চালাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। অনুমতি দেয়ার পর থেকেই নিজেদের বসত ভিটা, ফসলি জমি, বাঁধ, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ সহ নানা স্থাপনা বাঁচাতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন