প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৫ ২৩:১৩
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ছেলে মো. শাকিল আহমদ। এলাকার এক দালালের মাধ্যমে কয়েকটি দেশ পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর চুক্তি করেন তিনি। প্রাথমিকভাবে সাড়ে চার লাখ টাকায় চুক্তি হয়। টাকা পরিশোধের পর প্রথমে দুবাই যান শাকিল। সেখানে এক মাস অবস্থান শেষে অবৈধভাবে মিশরে প্রবেশ করেন এবং পরদিন লিবিয়ায় পৌঁছান।
লিবিয়ায় পৌঁছে শরিয়তপুরের এক দালালের সঙ্গে আবারও নতুন করে সাড়ে ৬ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। দালাল তাকে আশ্বাস দেয়, গেইমের মাধ্যমে ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। টাকা পরিশোধের পর ৪৮ জনের একটি দলের সঙ্গে গেইমের অপেক্ষায় থাকেন শাকিল। কিন্তু কিছুদিন পরই দালালই তাদেরকে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
পরে দালালচক্র ওই বাহিনীর কাছ থেকে কয়েকজনকে কিনে নেয় এবং তাদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। শাকিলসহ অনেকে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এখন তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, আর পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গেছে দালালের প্রতারণায়।
শাকিল আহমেদ বললেন, অনেক স্বপ্ন ছিল ইতালি যাওয়ার। এলাকার পরিচিত একজন বললেন, দুবাই থেকে মিশর হয়ে লিবিয়া যেতে হবে, তারপর সেখান থেকে নিরাপদে ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানো যাবে। লিবিয়া পর্যন্ত যেতে খরচ হবে সাড়ে চার লাখ টাকা। এমন প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রথমে দুবাই যাই। সেখান থেকে বিভিন্ন পথ পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছাই। লিবিয়ায় গিয়ে শরিয়তপুরের এক দালালের সঙ্গে নতুন করে সাড়ে ছয় লাখ টাকায় চুক্তি করি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমার সঙ্গে আরও অনেকেই ছিল। সবাই টাকা পরিশোধ করার পর দালালই আমাদের লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। আমাদের সঙ্গে যারা আটক হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে ওই দালাল টাকা দিয়ে কিনে নেয়। পরে তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এরপর তাদের খবর আর পাই নি।
তিনি বলেন, ধার-কর্য নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কষ্ট করে উপার্জন করে ঋণ শোধ করবো। কিন্তু এখন সবকিছু হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। শাকিল ২০২৩ সালের মে মাসে বিদেশ যেতে বাড়ি ছেড়েছিলেন, নানা ঝামেলা পোহানো শেষে ২০২৪’এর ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের কাছে ফিরেন তিনি।
শুধু শাকিল নয়, এরকম আরও অনেক তরুণ উন্নত জীবনের আশায় অনিয়মিত অভিবাসনের দিকে ঝুকছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম প্রত্যাশা ২- প্রকল্পের তথ্যমতে, গেল দুই বছরে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ২৬৫ জন তরুণ। তারা সবাই দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রার শেষ পরিণত হয়েছে দু:স্বপ্নে। ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি কেউ। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এসব তরুণ ও তাদের পরিবার। এদের মধ্যে অনেকেই লিবিয়ায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ভাটি সাফেলা গ্রামের বাসিন্দা জাকারিয়া আহমেদ ইয়াহিয়া জানান, দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ থেকে দুবাই, মিশরসহ আরও একটি দেশ হয়ে লিবিয়া যেতে তাকে দিতে হয়েছিল চার লাখ টাকা। লিবিয়ায় পৌঁছে আরও চার লাখ টাকায় চুক্তি করেন গেইমে সমুদ্র পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, গেইমে থাকতে হয়েছে ৮ থেকে ৯ মাস। কখনও একবেলা খেয়েছি, কখনও না খেয়ে দিন কেটেছে। পরে দালাল আমাদের ১২০ জনকে একটি নৌকায় তুলে দেয়। কিন্তু সাগরের মাঝপথে লিবিয়ার কোস্টগার্ড আমাদের আটক করে। পরে পাঁচ দিন কারাভোগের পর কুমিল্লার মাফিয়া রাসেল নামে এক ব্যক্তি তাকেসহ আরও এক বাংলাদেশিকে কিনে নেয়। তার বাড়িতে আরও অনেক মানুষ আটক ছিল। সবাইকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা নিতে বাধ্য করা হয়। যারা টাকা দিতে পারে নি, তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।
জাকারিয়া বলেন, আমাকে বলা হয়, দুই দিনের মধ্যে বাড়ি থেকে ৬ লাখ আনতে। আমি বাড়ির জমি বিক্রি করে টাকা পাঠাতে বলি। পরিবার দুইদিনের মধ্যে টাকা পাঠানোয় আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল।
তিনি আরও জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরেছি। এখনো ধারদেনা পরিশোধ করতে পারি নি।
তবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ইজিবাইক পেয়েছি। এখন সেই ইজিবাইক চালিয়েই সংসার চালাই।
বুধবার দুপুরে ব্র্যাক মাইগ্রেশনের গ্রোগ্রামের প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের অধীনে হাজিপাড়াস্থ অফিসে প্রবাসবন্ধু ফোরামের ত্রৈমাসিক সভায় বক্তারা বলেন, অনিরাপদভাবে ইউরোপে যাওয়ার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিরিয়া। পর্যায়ক্রমে রয়েছে তুনিশিয়া, মিশর, গিনি, পাকিস্তান, ইরিত্রিয়া, সুদানসহ আরও কয়েকটি দেশ। এছাড়াও গেল বছরে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ উন্নত জীবনের স্বপ্ন ও কর্মসংস্থানের আশায় বৈধভাবে বিদেশ গিয়েছেন। সে হিসেবে প্রতি ঘন্টায় বিদেশ যাচ্ছেন ১১৫ জন। এদের বড় অংশই দক্ষ নয়। বিশে^ ৩০ কোটি অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশের এক কোটির বেশি মানুষ রয়েছেন। গেল বছরে এই এক কোটি প্রবাসির আয় এসেছে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রভাস বন্ধু ফোরামের সভা শেষে কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে মাজেদা আক্তারকে সভাপতি, আব্দুল মতলিবকে সাধারণ সম্পাদক ও মিনা পালকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।
ব্র্যাকের এমআরএসসি কোওর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকে বিদেশ পাড়ি দেন। সুনামগঞ্জে ২৬৫ জন তরুণ দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে লিবিয়া থেকে ফেরত এসেছেন। যারা ফেরত এসেছেন তাদের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। অনেকেই লিবিয়া থেকে গেইমে ইতালি যাওয়ার সময় ভূ-মধ্য সাগরে ডুবে মারা যান। তাদের তথ্য নেই তাদের কাছে।
তিনি বলেন, প্রতারনার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুরো পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এক্ষেত্রে ফেরত আসা ব্যক্তি অনেক সময় পরিবারের উপরও বোঝা হয়ে দাড়ান। তাদের আবারও সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ব্র্যাক।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল বললেন,‘ জেলা প্রশাসনে প্রবাসী কল্যাণ সেল আছে। দূতাবাসের নির্দেশে প্রবাসীদের কল্যাণ বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে এই শাখা। অবৈধপথে যারা প্রবাসে যান, তাদের নিয়ে এই সেল কোন কাজ করছে না।’
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন