প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর, ২০২৫ ২৩:৪৩
জেলায় আগাম জাতের লাউ চাষে ব্যাপকভাবে বিটেল (গুবরে-পোকা) পোকার আক্রমণ হয়েছে। পোকা দমনে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের লাউ গাছের চারা এবং অনেক গাছের লাউ বড় হতে না হতেই মরে যাচ্ছে। বারবার কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কৃষকদের অভিযোগ, পরামর্শের জন্য কৃষি বিভাগের কোনও কর্মকর্তার দেখা মিলছে না। পোকা দমন বা নিধনে কৃষি অফিসের কোনও ধরনের সহায়তা কিংবা পরামর্শ পাচ্ছেন না তারা। তবে লাউ চাষে লাভবানও হয়েছেন কেউ কেউ।
কৃষকরা জানিয়েছেন, ভালো ফলনের আশা নিয়ে লাউ গাছর রোপণ করেছিলেন। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিটেল পোকা। পোকার আক্রমণে গাছের চারা ও লাউ মরে যাচ্ছে। জেলার দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর লাউসহ বিভিন্ন রকমের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৭০০ হেক্টর। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৩ হাজার ৩০ হেক্টর। এরমধ্যে পৃথকভাবে লাউ চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা না হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলার এলাকাগুলোতে কৃষকদের সাথে কথা বলে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করেছেন কৃষকেরা।
সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ১০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করেছেন কৃষকেরা। আবাদকৃত জাতের মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড, ডায়না, হাইগ্রিন, ময়না ইত্যাদি। তাহিরপুর উপজেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর উপজেলায় ২২৫ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করেছেন কৃষকেরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম মাছিমপুর গ্রামের একজন সফল কৃষক এবং উদ্যোক্তা গোলাপ মিয়া বলেন, আমি একজন ক্ষুদ্র কৃষক এবং উদ্যোক্তা। আমি এ বছর পানি লাউ চাষ করেছি। এক হাজার ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৪৫ ফুট প্রস্থ ভূমিতে প্রায় চারশত লাউ গাছের চারা রোপণ করেছি। কিন্তু আমার ভাগ্য খারাপ, প্রতিটি গাছে লাউ ধরার পরপরই মরে যায়। কেন মরে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না।
তিনি বলেন, আমাদের পশ্চিম মাছিমপুর এলাকায় তিন হাজার বিঘা জমি আছে। আমরা তিন বছর ধরে আমন ধান সহ বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করছি। এরমধ্যে একটা দিন কৃষি অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে আসতে দেখিনি। তারপরও আমরা নিজেই ফেইসবুক এবং ইউটিউবে দেখে দেখে চেষ্টা করছি, ফসল ফলানোর চেষ্টা করছি। এই লাউ চাষে আমি ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছি। এরমধ্যে ২০ হাজার টাকার মতো লাউ বিক্রি করেছি। কিন্তু বছর মনে হয়না যে লাউ চাষে লাভবান হতে পারবো।
তাহিরপুর উপজেলার পুরান লাউড় গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া এবার এক কেয়ার (২৮ শতক) ভূমিতে ডায়না জাতের লাউ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, লাউ গাছে ভালোই লাউ ধরেছে। কিন্তু গত কয়দিন আগে বৃষ্টির পর থেকে লাল জাতের পোকা গাছ নষ্ট করে ফেলছে, গাছ মরে যাচ্ছে। এতে করে এ বছর কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তিনি পোকা দমনে কৃষি অফিসের কারোরই সহযোগিতা পাননি বলে জানান।
একই গ্রামের ইমাম শরিফ বলেন, আমি ১৫ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছি। গত কয়দিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় লাউয়ের গাছগুলো মরে যাচ্ছে এবং গাছে লাউ ধরার পর লাউ বড় হওয়ার আগেই মরে যায়, এতে করে আমার লস হচ্ছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রামপুর গ্রামের জিহাদ মিয়া বলেন, আমি এক কানি (এক কেয়ার) জমিতে লাউ চাষ করেছি। প্রায় তিনশ চারা রোপণ করেছি। এ পর্যন্ত চার হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। এক কানি জমিতে লাউ চাষে আমার প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমি এবং আমার মা মিলে ক্ষেতের পরিচর্যা করি। তিনি বলেন, লাউ গাছের চারাগুলো একদিকে বড় হচ্ছে, গাছে লাউ ধরছে, অন্যদিকে মরে যাচ্ছে। কেন যে এমন হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। কৃষি অফিসের কেউ আমাদের খবর নেয় না, কোনদিন আসেও না।
জামালগঞ্জ উপজেলার শরিফপুর গ্রামের কৃষক মুক্তার হোসেন বলেন, আমি চল্লিশ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ করেছি। আল্লাহর রহমতে ভালো ফলন হয়েছে। এই লাউ চাষে আমার পয়তাল্লিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আজকে পর্যন্ত আশি হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, লাউ গাছ কিছু মরছে, এরপর নতুন করে রোপণ করেছি। এখনও মাঝে মধ্যে লাউ বড় হতে না হতেই একটা, দু’টো করে মরতেছে। কৃষি অফিস থেকে প্রথমে ত্রিশ কেজি সার পেয়েছি। কৃষি অফিসের স্যার আমার ক্ষেতে আসবেন বলেছিলেন, তবে আসেননি। নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো। আমি লাউ চাষের পাশাপাশি টমেটো, মরিচের চাষ করেছি। কৃষি অফিস থেকে সহায়তা এবং সুপরামর্শ পেলে আমাদের জন্য ভালো হয়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ১৫ শতক জায়গায় ময়না জাতের লাউ চাষ করেছি, ফলন ভালো হয়েছে। এ পর্যন্ত বিশ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। আশাকরি, আমি এ বছর লাউ চাষে লাভবান হবো।
এই রকমভাবে জেলার অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাউ চাষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি চাষে কৃষি অফিসের সুপরামর্শ এবং তদারকির অভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে কৃষকদেরকে। এতে করে প্রতি বছরই লাভের আশায় যে স্বপ্ন বুনছিলেন তারা, তার চেয়ে বেশি লোকসান গুনছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, লাউ গাছে বিটেল পোকা (গুবরে-পোকা) এর আক্রমণ হয়েছে। আমাদের জনবল সঙ্কট রয়েছে। লাউ চাষীদের সমস্যা সমাধানের জন্য, সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিলে আশাকরি সেই সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি উপসহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে কোনো রেসপন্স না পেয়ে থাকেন, তারা যদি পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হন বা তারা যদি কৃষকদের সাথে যোগাযোগ না করেন, তাহলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন। এরপরেও যদি কৃষকেরা রেসপন্স না পান, তাহলে আমাদেরকে জানালে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন