প্রকাশিত: ১২ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:৩৬
বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বিশেষ গোত্র ‘গাইন বেদে’। এরা গান গেয়ে, লোকজ চিকিৎসা অর্থাৎ, ভেষজ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও তাবিজ-কবজ করার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। গাইন বেদেরা কসমেটিকস সামগ্রী বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করে।
এছাড়াও এরা সাপের খেলা, বানরের খেলা বা জাদুবিদ্যা দেখিয়েও মানুষকে বিনোদন দেয় এবং ‘শিঙ্গার’ সাহায্যে বাত-ব্যথার মতো সমস্যা নিরাময় করে। দাঁত ব্যথা, দাঁতের পোকা নিরাময়ের কাজও করে থাকে। গান, সাপ খেলা, বানরের খেলা এবং জাদুবিদ্যা প্রদর্শন করে বিনোদন প্রদান করে। এই বেদেরা সাধারণত নদীতে নৌকায় বাস করে এবং ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে নৌকা ভেড়ায় সেখানে এই কাজ করে তারা।
জানা গেছে, দেশের হাওরাঞ্চলে নৌকায় বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তারা। এটা তাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য। তবে অনেকেই এখন ডাঙ্গায় বসবাস করে এবং অনেকেই স্থায়ীভাবে সামাজিকভাবে বসবাস শুরু করেছে। তাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য থেকে ফিরে এসে স্থানীয়দের সাথে মিলেমিশে ব্যবসা, চাকুরী সহ অন্যান্য পেশায় মনোনিবেশ করছে। দিরাই উপজেলার চান্দপুর গ্রামের পাশে কালনী নদীর তীরে ডজন খানেক নৌকায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ এবং শিশু-কিশোরদের বসবাস করতে দেখা যায়।
দিরাই পৌর শহরের সেনমার্কেটের সামনে থেকে রিকশায় দশ মিনিট সময় লাগে টুক দিরাই ফেরিঘাট পৌঁছতে। মঙ্গলবার দুপুরে ফেরি পার হয়ে টুক চান্দপুর এলাকায় গিয়ে জানা গেলো, বর্ষায় নৌকা (নাও) ছাড়া ওখানে যাবার কোনো উপায় নেই। হেমন্তের অর্ধেক সময়কাল যদিও পায়ে হেঁটে যেতে হয়, তবে পেক-কাদা মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হয় ওই এলাকার লোকজনদের। বেদে সম্প্রদায়ের (গাইন বেদে) লোকজনদের যারা নৌকায় বসবাস করে, তারা নৌকায়-ই চলাচল করে।
টুক চান্দপুর এলাকায় পৌঁছে কালনী নদীর তীরে বসবাসরত বেদেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা দেশ স্বাধীনের পর থেকে দিরাই উপজেলার চান্দপুর গ্রামের পাশে নদীর তীরে বসবাস করে আসছে। দেশ স্বাধীনের আগে তারা একই উপজেলার রফিনগর এলাকায় বসবাস করতো।
এই সম্প্রদায়ের লেচু মিয়া এবং আক্কল আলী বয়োজ্যেষ্ঠ, দুজনেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা দুজনেই বেদে সম্প্রদায়ের সরদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জানতে চাইলে বলেন, আমরা বেদে সম্প্রদায়ের (গাইন বেদে) মানুষ দিনে আনি দিনে খাই। খুবই অসহায়। আমাদের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে পড়াশোনা করে, আবার কেউ কেউ তাদের সন্তানদের টাকার অভাবে পড়াইতে পারে না। আমাদের চলায় খুবই সমস্যা হচ্ছে। সরকারি সহায়তাও আমরা পাই না। শীতকালে নদীতে নৌকায় থাকি। শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট করি। আগের মতো আয়-উপার্জনও নেই।
তারা আরও বলেন, বারোটি নৌকায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ সহ শিশু-কিশোরদের নিয়ে জীবন-যাপন করছেন তারা। এরমধ্যে সাতটি নৌকায় সৌর বিদ্যুৎ কিনে কোনরকম চলছে, বাকি যে পাঁচটি নৌকা আছে সেগুলোতে সৌর বিদ্যুৎও নেই। কুপি বাতি জ্বালিয়ে রাত কাটাতে হয়। এগুলো নষ্ট হলে ঠিক করতেও আমাদের সমস্যা হয়। তখন, রাতের বেলায় কুপি বাতি জ্বালিয়ে চলতে হয়।
অনেকেরই পূর্বের যে পেশা ছিল, সেই পেশা ছেড়ে দিয়ে দিনমজুরের কাজ এবং দোকানে কর্মচারী হিসেবে চাকরি করছে জানিয়ে বলেন, কেউ কেউ এই এলাকায় জায়গা কিনে ঘর নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। তবে চলাচলের কোনো সড়ক নেই। এই সমস্যাগুলোর যদি সমাধান হতো, তাহলে উপকৃত হতো। সরকারিভাবে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা হলে খুবই উপকার হতো।
এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার বলেন, চান্দপুর এলাকায় কালনী নদীর তীরে বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন