পঙ্গুত্ব দমাতে পারেনি ইসলাম উদ্দিনকে

প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:৩১

প্রায় পাঁচ বছর আগে বলগেটে চাকরি করতেন ইসলাম উদ্দিন, সে সময় তার ছিল বয়স ২০ বছর। বেতন ছিল মাসে ৮ হাজার টাকা। বলগেট চালাতে গিয়ে ২ টি বলগেটের মাঝে পড়ে কোন রকম জীবন বাঁচলেও শেষ রক্ষা হয়নি, কেটে ফেলতে হয় দুইটি পা। সেই ইসলাম উদ্দিন আজ ২৫ বছরের যুবক। শারীরিক অক্ষমতা নয়, মানসিক ধীরতাকে নিজের জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছেন তিনি। দুই হাতকে সঙ্গী করে জামালগঞ্জে অলিতে-গলিতে বসে ডিম ও সবজি বিক্রি করেন। ঐকান্তিক দৃঢ় মনোবলে তিনি এখন ক্ষুদে ব্যবসায়ী। 

 


জানা যায়, জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের ঘাগটিয়া গ্রামের মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে ইসলাম উদ্দিন। পরিবারের বাবা-মা সহ সদস্য সংখ্যা ৬ জন। এলাকাবাসী জানান, পা না থাকায় ইসলাম উদ্দিনকে পরিবারের লোকজন গাড়িতে তুলে দেন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ করে জামালগঞ্জ মসজিদের সামনে অথবা যে কোন দোকানের সামনে বসে ডিম বিক্রি করেন। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ডিম সংগ্রহ করে এবং মন্নানঘাট বাজার থেকে সবজি কিনে সকালে ঘাগটিয়া বাজারে সবজি ও বিকালে জামালগঞ্জ বাজারে ডিম বিক্রি করেন। এসব করেই চালিয়ে নিচ্ছেন পরিবারের ভরণপোষণ। 


ইসলাম উদ্দিন জানান, সকাল হলেই বিভিন্ন গ্রাম থেকে ডিম সংগ্রহ করে উপজেলা সদরে ডিম বিক্রয় করি। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হালি ডিম বিক্রি করতে পারেন। এতে ৪ থেকে ৫শত টাকা আয় হয়, তা দিয়ে কোন রকমে চলছে সংসার। 

 


তিনি আরও জানান, পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে বলগেটে ৮ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করেন। বলগেটে জাফলং থেকে বালি ভর্তি করে যশোর জেলার নড়াইলে যায়। বলগেট ভিড়ানোর সময় পাড়ে ভিড়ানো থাকা আরেকটি বলগেটের সাথে ধাক্কা লেগে দুই বলগেটের মাঝে চাপা পড়ে আমার দুই পা থেঁতলে যায়। পড়ে যশোর হাসপাতালে ভর্তি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ঢাকা প্রেরণ করেন। এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে একটি পা কেটে ফেলতে হয়। এক বছর পর আরেকটি পা কেটে ফেলতে হয়। নিজের সব কিছু বিক্রি করে অন্যের কাছ থেকে ধার দেনা করে চিকিৎসা করি। চিকিৎসায় প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়। আমার বাবা মা ছোট দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে একমাত্র পরিশ্রমী আমি একাই। অন্যরা ছোট থাকায় ৫ হাজার টাকা ঋণ করে সকালে ঘাগটিয়া পয়েন্ট, মন্নানঘাট থেকে সবজি এনে বিক্রি করি। বিকালে জামালগঞ্জ মসজিদের সামনে ডিম বিক্রি করি। 

 


ইসলাম উদ্দিনের কাছ থেকে ডিম কিনেছেন এক বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, দুই পা বিহীন ইসলাম উদ্দিনের কাছ থেকে ডিম কিনে অবাক হয়েছি। আমার খুব মায়া লেগেছে তার জন্য। পা না থাকার পরও ভিক্ষা না করে বেছে নিয়েছে ব্যবসা। তার এই ইচ্ছা শক্তিকে আমি ধন্যবাদ জানাই।  

 


আরেক ক্রেতা জামাল উদ্দিন বলেন, দূর থেকে দেখলাম জামালগঞ্জ মসজিদের সামনে এক যুবক ডিম বিক্রয় করছেন, কাছে এসে দেখি দুই পা নাই। খুব খারাপ লাগলো, নিজে ২ হালি ডিম কিনে ১২০ টাকার জায়গায় ১৫০ টাকা দিতে চাইলে সে জানায়, যা দাম আছে তাই দিন, বেশি টাকা আমি নেব না। 

 


ঘাগটিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য মো. বাবুল মিয়া বলেন, ইসলাম উদ্দিনকে আমরা চিনি। তার বাড়ি আমার গ্রামে। সে বলগেট নৌকায় শ্রমিকের কাজ করতো। ২ টি বলগেটের ধাক্কা লাগলে তার দুই পায়ে চাপা পড়ে, যার কারণে তার পা দুটি কেটে ফেলতে হয়েছে। আমরা অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ করে ভিক্ষা করতে দেখেছি। কিন্তু সে তা না করে ব্যবসা করে তার এবং পরিবারের ভরণপোষণ করে যাচ্ছে। তার এই সংগ্রামী জীবন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। 

 


উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা সাব্বির সারোয়ার জানান, ইসলাম উদ্দিনকে আমি চিনি। সে প্রতিদিন মসজিদের সামনে ডিম বিক্রি করে। ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় তাকে উপজেলা সমাজসেবা উপজেলা কার্যালয় থেকে ব্যবসার উপকরণের জন্য সহায়তা করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাকে ব্যবসা করার জন্য আরও সহায়তা করা হবে। সে যেন ভিক্ষাবৃত্তি না করে সম্মানজনক উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে সে বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সচেষ্ট রয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার