প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:৪৩
হাওরের পানি দেখে, সাঁতার কেটে উচ্ছসিত সারাদেশের মানুষ- সেই হাওর আর তার পানিই সুনামগঞ্জকে পিছিয়ে রেখেছে শিক্ষাখাতে। এ জেলায় পানি মানেই অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর দারিদ্রতা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, সুনামগঞ্জে শিক্ষিত নয় ৪০.৯১ শতাংশ ও স্বাক্ষর পারে না ৩৪.৯৮ শতাংশ মানুষ। যা বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি।
বর্ষা বন্যায় বছরের ৬-৮ মাস জেলার অধিকাংশ জায়গা নিমজ্জিত থাকে পানিতে। একেকটি বাড়ি বা গ্রামগুলো তখন পরিণত হয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। নৌকা ছাড়া কোন গতিই নেই এখানে। আবার নৌকা মানেই যেন পরাধীনতা, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে। ফলে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় স্কুল মুখো হতে পারে না হাওরাঞ্চলের শিশুরা।
বর্ষাকালে ঘরে বসে না থেকে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয় মাছ ধরায় আর শুষ্ক মৌসুমে জমিতে ধান চাষে। একসময় শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ধীরে ধীরে নামটাও কাটা যায় হাজিরা খাতা থেকে। শিশুদের মত শিক্ষকরাও নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করছেন। সকালে পৌঁছানোর কথা থাকলেও শিক্ষকের নৌকা স্কুলে পৌছেছে দুপুরে। নিজেরাই যেখানে বন্দি পানির কাছে সেখানে শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে নিতে পারেননি চোখে পড়ার মতো উদ্যোগ। একারণে ব্যাহত হতো শিক্ষা।
তাহিরপুরের হাওরে দ্বীপের মতো গ্রাম জয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবু তালেব জানায়, বর্ষার পুরোটা মৌসুম পানিতে থৈ থৈ থাকে। কখনো বাড়ির মধ্যে পানি ঢুকে। চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌকা অনেক সময় মিলে না। এতে বেশিরভাগ সময় স্কুলে যাওয়া হয় না তার।
প্রধান শিক্ষক মাসুদুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, ভৌগোলিক কারণে সুনামগঞ্জ হাওরবেষ্টিত জেলা। এর উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইদানিং পানি অধিক সময় স্থায়ী হয়। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপর।
ছিলানি তাহিরপুরের বায়োজ্যেষ্ঠ মো. আব্দুর রব বলেন, বর্ষাকাল আসলে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো স্কুলে উপস্থিত হয় না। একারণে আমাদের সন্তানরা শিক্ষায় পিছিয়ে থাকে।
শান্তিগঞ্জের শিক্ষার এই চিত্র খুব হতাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহাকে। কিভাবে শিক্ষার চিত্র বদলে দেওয়া যায় তা নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। শিশুদের ঝরে পড়া কমাতে হবে, বাড়াতে হবে শিক্ষার মান। সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা। যেন নতুন এক লড়াই।
সুকান্ত সাহা বলেন, আমি শান্তিগঞ্জে যোগ দেয়ার পর বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখি বাচ্চারা ঠিকমতো স্কুলে উপস্থিত হচ্ছে না। এখানে বছরের অধিকাংশ সময় পানি থাকে। বাচ্চারা সাধারণ জ্ঞান রাখছে খুব অল্প। একটা ক্লাসে হাতে গোনা যে কজন ভালো শিক্ষার্থী আছে শিক্ষকরা তাদেরকেই বেশি মূল্যায়ন করছেন। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের যে আলাদা ভালো পরিচর্চা করতে হবে সেটা ছিলো না। অনেক ভালো শিক্ষক আছেন যাদেরকে সঠিক মূল্যায়ন না করার কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন- চিন্তা করলাম কিভাবে সবাইকে সমান মূল্যায়ন করা হয় সেই পদ্ধতি বের করতে হবে। এর থেকে এই মানোন্নয়ন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো খারাপ সবার ফলাফল গড় উপস্থিতিতে মূল্যায়ন করা হবে। যাদের উপস্থিতি কম থাকবে তারা গড় ফলাফল কম পাবে। এতে গুটিকয়েক ভালো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারবে না, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে সবাইকে নিয়ে করতে হবে। এতে করে বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হলো ভালো করার।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই পরীক্ষার মাধ্যমে উপস্থিতি বাড়াতে পেরেছি। প্রাথমিক শিক্ষার কোন কোন জায়গায় সমস্যা আছে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করতে পেরেছি। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান ও জবাবদিহিতার আওতায় আনছি। এখন উপস্থিতি ও শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও বেশি যত্নবান হচ্ছেন শিক্ষকরা।
শান্তিগঞ্জের তেঘরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রুপন্তি তালুকদার জানায়, যখন থেকে আমরা শুনেছি এমন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে তখন থেকে আমাদের ক্লাসে উপস্থিতি বেড়েছে। আমাদের সহপাঠী যারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতো না তারাও এসেছে। যারা আসে নি শিক্ষকরা তাদের বাড়িতে গিয়ে বিদ্যালয়ে এনেছেন। আমাদের সবার একটা চেষ্টা ছিলো নিজেকে ও বিদ্যালয়কে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার।
সদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া আক্তার বলেন, এই এলাকার অভিভাবকরা এতো সচেতন নয়। কিন্তু এই পরীক্ষার কারণে তারা সচেতন হয়েছেন। আমরা যারা তারা আগেও চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখন প্রতিযোগিতা হওয়ায় বাড়তি দায়িত্ব পালন করছি- বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষার মান বাড়ানোর কাজ করছি। এরফলে আমাদের বিদ্যালয় সহ অন্যান্য অনেক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপস্থিতি পেয়েছি। সবাই চায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ করতে। এই সুযোগ পাওয়ায় আমরা আরও সচেতন হয়েছি।
রথপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, আমাদের অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে আমরা একটা ক্লাসে ৪-৫ জন শিক্ষার্থীদের ভালো পারফরম্যান্স দেখেই মনে করতাম আমরা ভালো করছি। কিন্তু এই পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি সকলের জন্য কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং আমরা সেই লক্ষেই এখন কাজ করে যাচ্ছি।
এই উদ্যোগের মাত্র ৬ মাসে শান্তিগঞ্জে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে ৭ শতাংশ। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে কমে এসেছে সাড়ে ৯ শতাংশ। এই সফলতাকে আরও বেশি কার্যকর করার জন্য ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে জেলাব্যাপি পরীক্ষার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া বলেন, শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিকে। প্রাথমিক থেকেই যদি শিক্ষার ভিত্তি ভালো করা না যায় তাহলে ফলাফল ভালো হবে না। আমাদের এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভালো শিক্ষা নেয়া ও দেয়ায় আগ্রহী করা। শান্তিগঞ্জ মডেল দেখিয়েছে যে এটা সম্ভব। তাই পুরো জেলাব্যাপি এই পরীক্ষার আয়োজন করেছি। আমরা এটা করেছি পরের বার আরেকজন এসে এটা করবে তার নিশ্চয়তা নেই। এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে হাওরের প্রাথমিক শিক্ষা অনেক এগিয়ে যাবে। এটা করাও খুব সহজ। প্রাথমিকে বছরে দুটি পরীক্ষা হয়। একটি পরীক্ষার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনকে দিয়ে দিলে সহজেই এই পরীক্ষা আয়োজন সম্ভব।
উদ্যোগী ইউএনওকে অভিনন্দনপত্র পাঠানোর পর সেরা শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সৃজনশীল উদ্যোগ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে উদ্যোগটি জাতীয়ভাবে আলোচনার কথা জানিয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন পোদ্দার। যার প্রেক্ষিতে আজ বুধবার (২৬ নভেম্বর) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে হাওরে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ঝরে পড়া রোধে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ইউএনও সুকান্ত সাহা’র উদ্যোগে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঢাকায় সেমিনার হবে। সেমিনারে নতুন মূল্যায়ন পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন ও আলোকপাত করবেন মূল্যায়ন পদ্ধতির উদ্ভাবক শান্তিগঞ্জের ইউএনও সুকান্ত সাহা ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন