প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২২:০০
সুনামগঞ্জ পৌরসভা
সারাদেশের মধ্যে উন্নত নাগরিক সেবা, সুশাসন ও সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন এ গ্রেডের পৌরসভার একটি সুনামগঞ্জ পৌরসভা। যা পৌরসভার মানদণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ মানের। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ গ্রেডের এই পৌরসভার ২১৮টি জায়গায় ময়লার ভাগাড় চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে আবাসিক বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। কিছু কিছু জায়গায় পৌরসভার ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও ডাস্টবিনে না ফেলে তার নিচে বা আশপাশে ফেলা হয়েছে। ময়লা আবর্জনা ফেলেছেন এই শহরেরই কিছু নাগরিক।
পরিচ্ছন্ন পৌরসভা সুস্থ নগর জীবন স্লোগানে সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জ পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা পক্ষ উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশে এই তথ্যের সাথে ২১৮টি স্থানের ২৮৮টি স্থির চিত্র প্রকাশ করা হয়। পৌরসভা নিজস্ব উদ্যোগে জরিপ করে এই তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছে। জরিপে যেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলায় সবচেয়ে এগিয়ে ১ নম্বর ওয়ার্ড। সবচেয়ে কম ময়লা আবর্জনা করেছে ৬ নম্বর ওয়ার্ড।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, নবীগর, মাইজবাড়ি, ষোলঘর কলোনি রোড, কলোনি উত্তর ও দক্ষিণ, বনানীপাড়া, ধোপাখালী আটটি মহল্লা নিয়ে ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪০টি জায়গায় ময়লা আবর্জনা ফেলে ময়লার ভাগাড় বানিয়েছেন বাসিন্দারা। বিলপাড়, কুরিয়ারপাড়, হাছননগর, ফায়ার স্টেশন এলাকা, ইউনিয়ন ভূমি অফিস এই পাঁচটি মহল্লা ২ নম্বর ওয়ার্ডে আছে ১১টি ময়লার ভাগাড়। পাঠানবাড়ি, আফতাব নগর, সুলতানপুর পূর্ব ও পশ্চিম, কেজাউড়া, নতুন হাছননগর ছয়টি মহল্লার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২০ টি ময়লার ভাগাড়। মোক্তারপাড়া, মধ্যবাজার, সোমপাড়া , রায়পাড়া, জেল রোড, উকিলপাড়া, আলিমাবাগ, শান্তিবাগ, পশ্চিম বাজার ৯টি মহল্লার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার ভাগাড় ৩৭টি। কালিবাড়ি, জামাইপাড়া, বাঁধনপাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম নতুনপাড়া, পূর্ব হাজীপাড়া ছয়টি মহল্লার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার ভাগাড় ২৪টি। উত্তর, দক্ষিন ও মধ্য আরপিননগর, জামতলা, পশ্চিম বাজার পাঁচটি মহল্লার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সবচেয়ে কম ময়লার ভাগাড় ১০ টি। পূর্ব ও পশ্চিম তেঘরিয়া দুটি মহল্লার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার ভাগাড় ২৬টি। মল্লিকপুর, পশ্চিম হাজীপাড়া, বড়পাড়া তিনটি মহল্লার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩ টি। কালিপুর (হাছনবসত, গনিপুর), পিরিজপুর, ইকবাল নগর, ওয়েজখালি, জলিলপুর পাঁচটি মহল্লার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার ভাগাড় ১৭ টি।
পৌরসভার নাগরিকরা ৯টি ওয়ার্ডের ২১৮ টি জায়গায় ময়লা আবর্জণা ফেলে ভাগাড় বানালেও এসব স্থান থেকে ময়লাগুলো তুলে আনতে পারেনি সর্বোচ্চ মানের এ গ্রেডের পৌর কর্তৃপক্ষ। এই বর্জ্য পৌরসভা বা প্রশাসন সৃষ্টি করেনি, এ শহরের নাগরিকরা অসচেতনভাবে করেছেন। নাগরিকরা সচেতন না হলে কয়েক লক্ষ মানুষের আবাসস্থলের বর্জ্য মাত্র ৪৭ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী দিয়ে পরিষ্কার করা সম্ভব না বলেও জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক। শহর নোংরা করার দায় যে একা নাগরিকদের না কিছুটা পৌর কর্তৃপক্ষেরও আছে সেটা চোখে সমাবেশেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সিভিল সার্জন। বছরে কয়েক লক্ষ টাকা কর দিলেও উনার নিয়ন্ত্রণাধীন কার্যালয়ের ময়লা আবর্জনা ঠিকমতো তুলে আনে না পৌরসভা। তবে এতো কথার পরও নাগরিকদের মনে আশা জাগিয়েছে পৌরসভার নিজ উদ্যোগে জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য এরকম একটি নাগরিক সমাবেশ করে মতামত নিয়ে পাক্ষিক পরিচ্ছন্নতা আয়োজন করায়। সমাবেশে বিভিন্ন মতামত ও অভিযোগ তুলে ধরেন নাগরিকরা। তার প্রেক্ষিতে পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে ১ নম্বর ওয়ার্ডকে পাইলট এলাকা হিসেবে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান জেলা প্রশাসক। পাইলট প্রকল্প এলাকা আদর্শ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এলাকা হলে পরে পুরো শহরে বাস্তবায়নের কথাও জানান মতবিনিময় সভায়।
বক্তব্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) চাতক চাকমা বলেন, আমি নতুন এসেছি এই শহরে। মানুষ অনেক সহযোগী মনোভাবাপন্ন। প্রাকৃতিক সুন্দর এবং নির্মল মনের মানুষের একটি শহরে ময়লা আবর্জনা থাকাটা বেমানান। সুনামগঞ্জ সুন্দর শহর, সম্মিলিত সহযোগিতায় সুন্দর রাখতে হবে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা আজকে ছবিতে দেখলাম ডাস্টবিন আছে তবুও তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ময়লা আবর্জনা। আমরা যদি ডাস্টবিনের কাছে না গিয়ে আবর্জনার প্যাকেট দূর থেকে ঢিল মারি তাহলে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আমরা প্রয়োজনে মাস্ক পড়ে যাবো, একটু কষ্ট হলেও কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলবো। আমাদের অসচেতনতার কারণে আমরা আমাদের শহরকে নোংরা করছি।
সিভিল সার্জন জশিম উদ্দিন বলেন, আপনার বাসা কতটুকু পরিষ্কার থাকবে সেটা নির্ভর করে আপনার উপর। ঠিক তেমনি আপনার পৌরসভা কতটা পরিষ্কার থাকবে সেটা নির্ভর করে আপনার উপর। আমার বাসার সামনে ডাস্টবিন থাকার পরও চারপাশে ময়লা আবর্জনা ফেলতেন বাসিন্দারা। কারা ফেলে সেটা দেখলাম, দেখে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করি পরে আর তারা ময়লা ফেলেননি। আমাদের সবার এরকম দায়িত্বশীল হতে হবে। ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার পর পৌরসভার মানুষ ময়লা নিলেও দুর্গন্ধ থেকে যায়। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে বিকল্প কি করা যায় সেটি ভাবতে হবে পৌরসভাকে।
পৌর প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, বর্জ্য নিষ্কাশন ও অপসারণকে আমরা ততটা গুরুত্ব দেই না যতটা পাওয়া উচিত। সেই উপলব্ধি থেকে আমরা ১৫দিনের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আমাদের রাস্তার পাশে, রাস্তায় অসংখ্য প্লাস্টিক, পলিথিন প্যাকেট পড়ে থাকে। ড্রেনের স্লাব সরিয়ে দেখেছি পানির প্রবাহ কম। কারণ ড্রেনের ভেতরে পলিথিনের প্যাকেট, মাটি বালু ইত্যাদি। এগুলো সরানো পৌরসভার দায়িত্ব। কিন্তু এগুলো যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা নাগরিকদের কাজ। নাগরিকরা যদি নিজ দায়িত্ব ভুলে যান তাহলে পৌরসভা সীমিত জনবল নিয়ে ২২.১৭ বর্গকিলোমিটারের শহরের সকল কাজ কিভাবে করবে। আমরা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রত্যেক এলাকায় একজন করে সুপারভাইজার দিয়েছি। যারা ময়লা নেয়ার কাজগুলো দেখভাল করবে। কোন এলাকার ময়লা আনা না হলে নির্দিষ্ট এলাকার সুপারভাইজারকে জানাবেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, সুরমা নদীর পাশ দিয়ে গেলে দেখা যায় আসলে ময়লা আবর্জনার কি চিত্র। সবাই ময়লা আবর্জনা জমা করে স্তূপ করে নিয়ে ফেলছে নদীর পাড়ে। এগুলো সরাতে গেলে পৌরসভার এক বছর লাগবে। এই ময়লাগুলো কারা ফেলছে, নিশ্চয়ই এই এলাকার মানুষ। সবাই যদি যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলে ভাগ ভাগ করে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলি তাহলে ময়লা আবর্জনা দেশের সম্পদ হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করা যাবে, অন্যান্য জৈব বর্জ্য সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আমরা যদি সচেতন না হই এর খারাপ প্রভাব আমাদের সবার উপরই পড়বে। ফুসফুস আক্রান্ত সহ সবাই বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা সবাই যদি সচেতন হই যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। পৌরসভা তার কাজ করলে সবাই পৌর কর দেয়া বন্ধ করে দিবেন। কিন্তু তার আগে আপনারা নিজে ঠিক হতে হবে। নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করতে হবে।
নাগরিক সমাবেশ শেষে জন সচেতনতামূলক বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। এরপর পৌর হিসাব রক্ষক সন্তোষ কুমার দাসের সঞ্চালনায় নাগরিক সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালী কৃষ্ণ, সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস, কনজার্ভেন্সি সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর আলম সহ বিশিষ্টজনরা।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন