হাওরাঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া গাজী-কালুর গান

প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২৩:৪০

নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহের কাজে জেলার দুর্গম উপজেলা মধ্যনগরে যাই। সেখান রাতে স্থানীয় এক সহকর্মীর মোটরসাইকেলে করে হাওরের বুক চিরে বলরামপুরের পথে যাত্রা করি। হাওরের বাতাসে তখন শীতের হালকা ছোঁয়া, চারপাশে নিস্তব্ধতার রাজত্ব। মনে হচ্ছিল সময় যেন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।


রাত প্রায় ১০টা। মধ্যনগর উপজেলার প্রত্যন্ত বলরামপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে মানুষের ভিড়। সাদামাটা এক উঠান, বাঁশের মাচা আর লণ্ঠনের মৃদু আলোয় আলোকিত পরিবেশ। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল বিশ বছর আগের গ্রামবাংলা যেন হঠাৎ ফিরে এসেছে।

 


বুধবার রাতে বলরামপুর গ্রামের বাবুল মিয়ার বাড়ির উঠানে আয়োজন করা হয় গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতি গাজী-কালুর কিচ্ছা পালা। যা মানুষের মুখে মুখে এখনও পরিচিত গাজী-কালুর গান নামে।


মধ্যনগরের সহকর্মী আতাউর রহমান জানালেন, এক সময় হাওরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বসত এই পালাগানের আসর। বিদ্যুৎ, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল বিনোদনের আগের দিনে গ্রামবাসীর আনন্দ, অপেক্ষা আর ভালোবাসা জড়িয়ে থাকত এই কিচ্ছা পালাকে ঘিরেই। সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিই যেন আবার নতুন করে ফিরে এলো বলরামপুর গ্রামে।

 


আসর শুরু হতেই দর্শকের সারিতে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস দেখা যায় প্রবীণদের মধ্যে। কেউ গভীর মনোযোগে গান শুনছেন, কেউ আবার ভেজা চোখে ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের স্মৃতিতে। বরখলা গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বি মো. বারেক মিয়া বলেন, হাওর এলাকার মানুষ এখনও আগ্রহ নিয়ে এই কিচ্ছা কাহিনী শোনেন। এই সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছা. রহেমালা বলেন, এক সময় এই গানই ছিল রাতের আসরের প্রধান আকর্ষণ। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও বদলেছে- তাই এখন খুব কমই এমন আয়োজন দেখা যায় হাওর এলাকার গ্রামগুলোতে। 

 


এই আসরে শুধু প্রবীণরাই নন, সমান আগ্রহে উপস্থিত ছিলেন গ্রামের তরুণ-তরণী, যুবক-যুবতীরা। কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ আবার গানের গল্প বুঝতে প্রবীণদের কাছে প্রশ্ন করছেন। মা-বোনদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

 


এই আসরে আসা সুফিয়া নামে এক তরুণী বলেন, এমন আয়োজন এখন আর দেখা যায় না। সুযোগ পেয়ে সবাই শুনতে এসেছি আমরা।
গাজী-কালুর কিচ্ছা পালা পরিবেশন করেন বরখলা গ্রামের শিল্পী মো. রফিক বয়াতি ও তাঁর সহশিল্পীরা। আসর শেষে রফিক বয়াতি বলেন, এগুলোই আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য, আমাদের শেকড়। মানুষ এখনও আগ্রহ নিয়ে শোনেন এই কিচ্ছা কাহিনী, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

 


স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল কাইয়ুম মজনু বলেন, গাজী-কালুর গান শুধু একটি পালা নয়, এটি গ্রামীণ বাঙালির লোকসংস্কৃতির স্মৃতি, বিশ্বাস ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা গল্প। বলরামপুর গ্রামের এই আয়োজন প্রমাণ করে যত আধুনিকতাই আসুক, মানুষ কখনও তার শেকড়ের টান ভুলে না।


বলরামপুর গ্রামের স্থানীয় সংবাদকর্মী হানিফ মিয়া বলেন, গ্রামবাসীর প্রত্যাশা সামনে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করা হবে। যাতে হারিয়ে যেতে বসা গাজী-কালুর কিচ্ছা পালা আবার ফিরে পায় তার হারানো মর্যাদা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার