প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০০:২৯
একফসলি হাওরাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরোর আবাদ পুরোদমে চলছে। বোরো ধানের ভান্ডার খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার অন্তত ৯০ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন এই ধান। বছরের কার্তিক, অগ্রহায়ণ মাস থেকে হাওরজুড়ে শুরু হয় কৃষকদের বীজতলা সাজানো, গোছানো, বীজ বপন এবং ধানের চারা রোপণের কাজ। পৌষের শুরু থেকেই বোরো ধান রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। কৃষি কাজে হাওরাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য একটা বাড়তি আয়ের উৎস। কৃষকের জমি চাষাবাদ যত বেশি হয়, ততই শ্রমিকদের কদর বাড়ে, তাদের আয়- রোজগারের সুযোগ সুবিধা বাড়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ১০ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বীজতলা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২ হাজার ৭২০ হেক্টর হাইব্রিড, উপশী ৭ হাজার ৭৩০ হেক্টর এবং স্থানীয় ৬০ হেক্টর। এরমধ্যে রবিবার পর্যন্ত জেলায় ৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
সরেজমিনে জেলার একাধিক উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আমন ধান কাটা-মাড়াই কাজ শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে এবং একইসাথে এলাকার কৃষকরা বোরো চাষের কাজ শুরু করেছেন। কৃষকরা বোরো চাষের প্রথম পর্যায়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চারা রোপণে। শাল্লা এবং দিরাই উপজেলায় দেখা যায়, বোরো আবাদের জন্য কেউ কেউ চারা সংগ্রহ করছেন এবং কোথাও কোথাও রোপণ কাজ শুরু করেছেন।
শাল্লা উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের ছুমায়ুন বলেন, আমাদের বিশ কেয়ার জমিতে এ বছর বোরো আবাদ করব। আমরা তিন কেয়ার জমিতে বীজতলা তৈরি করেছি। আমাদের জমি চাষাবাদ করার পর যে বীজতলার চারা অতিরিক্ত থাকবে, তা বিক্রি করব। আজকে পর্যন্ত তিন কেয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং ঠান্ডা কম হওয়ায় ক্ষেতে কাজ করতে আমাদের জন্য খুবই সুবিধা।
জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের সুলমান উদ্দিন বলেন, এ বছর ২৪ কেয়ার জমিতে বোরো আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছি। এই লক্ষে ঝলক জাতের বীজ, ৮৮ এবং ১১২ জাতের ধান রোপণের জন্য বীজতলা তৈরি করছি। বীজতলা তৈরি শেষ হয়েছে, দুই-একদিন পর রোপণ শুরু হবে।
দিরাই উপজেলার শরীফপুর গ্রামের শ্রমিক তুহির মিয়া বলেন, আমরা দিপু মিয়ার ক্ষেত রোপণের জন্য জালা টানছি। (চারা উত্তোলন করছি)। আগামীকালই প্রায় ১০ কেয়ার জমিতে বোরো আবাদ শুরু করবো। এই হাওরে দিপু মিয়ার প্রায় ১৫০ কেয়ার বোরো জমি আছে, এই জমিগুলোতে আমরা রোপণ করবো। ৫০০ টাকা রোজে আমরা দিপু মিয়ার ক্ষেতে চারা সংগ্রহ এবং রোপণ কাজ করে থাকি।
একই গ্রামের জিহাদনুর বলেন, বোরো ধান হাওরাঞ্চলের প্রধান ফসল। আমরা প্রতি বছর এই সময়টাতে হাওরে বীজতলা তৈরি করি ও চারা রোপণের উপযুক্ত হলে রোপণ করি। আমরা সাধারণত অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু করে মাঘ মাস পর্যন্ত বোরো আবাদে কাজ করি। দৈনিক ৫০০ টাকা রোজে কাজ করছি এবং দুপুরের খাবার মালিকের পক্ষ থেকে আমরা খাই। আজকে থেকে পুরোদমে আমরা বোরো আবাদ শুরু করছি।
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, উপজেলায় এ বছর বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ হাজার ৫০৫ হেক্টর। বীজতলার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ হেক্টর। এরমধ্যে হাওরে বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা হাওরে ২৭৭ হেক্টর এবং নন-হাওরে ৭৭ হেক্টও, হাইব্রিড মিলিয়ে ৩৫৪ হেক্টর। উপশী জাত হাওরে ৫৩২, নন- হাওরে ২৫৩ মিলিয়ে ৭৮৫ হেক্টর। এছাড়াও স্থানীয় জাত ১ হেক্টর মিলিয়ে সর্বমোট ১ হাজার ১৩৭ হেক্টর। এরমধ্যে অগ্রগতি ৬৯০ হেক্টর। আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে বোরো আবাদ শুরু হবে।
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আসয়াদ বিন খলিল রাহাত জানান, এ বছর উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৯১০ হেক্টর। এই লক্ষে বীজতলা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫৩৪ হেক্টর। ইতোমধ্যে বোরো আবাদ শুরু হয়েছে। আজকে পর্যন্ত প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষকেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ১০ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বীজতলা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২ হাজার ৭২০ হেক্টর হাইব্রীড, উপশী ৭ হাজার ৭৩০ হেক্টর এবং স্থানীয় ৬০ হেক্টর। সুনামগঞ্জে কৃষকেরা পুরোদমে বীজতলা প্রস্তুত কাজ শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত বীজতলার কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু কিছু এলাকায় রোপণ শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বীজতলায় কোনো সমস্যা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আজ (রবিবার) পর্যন্ত জেলায় ৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষকেরা। আগামী সপ্তাহে পুরোদমে বোরো আবাদ শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বীজতলা তৈরিতে কোনো সমস্যা হয়নি। চাষাবাদের ক্ষেত্রেও আশা করি কোন সমস্যা হবে না।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন