প্রকাশিত: ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২২:২১
একটি ফুলকপির উৎপাদন খরচ ১০ টাকা থেকে ১২ টাকার বেশি, কিন্তু কৃষককে বিক্রয় করতে হচ্ছে ৫—৬ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটার দাম ৯ টাকা থেকে ১০ টাকার মধ্যে।
শনিবার থেকে শুরু হয়ে সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জের সবজির বাজারে মূল্যে এমন ধস ছিল। ফুলকপিসহ অন্যান্য সবজির দর গ্রামীণ এলাকায় অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাজারগুলোতে সবজির দামও অনেক কমেছে। এতে ভোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও কৃষকদের মধ্যে হতাশার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
কৃষকরা বললেন, ‘জমিতে উৎপাদিত সবজি বাজারে নিয়ে এসে বিপদে আছি, পাইকার নেই। সবজি চাষে অনেক খরচ করতে হয়েছে, কষ্ট তো আছেই। সার, বীজ, কীটনাশকের খরচ বেড়েছে অনেক। লাভ তো দূরের কথা, বিক্রি করে খরচের টাকা উঠছে না। ঋণ করে এবং ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে সার,বীজ সহ কীটনাশক ওষুধ বাকিতে কিনেছি। এখন ফসল উৎপাদন করলেও সেই যে ঋণ এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার মৌসুমের শুরুতে শীতকালীন সবজির ফলন ও দাম দুটিই ভালো পেয়েছেন কৃষকরা। এখন কিছুটা কমলেও উৎপাদন খরচ উঠে যাবে।
বাজারে এখন সস্তায় মিলছে সবজি। গত শনিবার, রবিবার এবং সোমবার সকালে সুনামগঞ্জ শহরের পাইকারি সবজি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৫—৬ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে। শিম প্রকার ভেদে ১৫—২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি, আলু ১৫—২০ টাকা কেজি, বেগুন ২৯—৩০ টাকা কেজি, মূলা প্রতি হালি ৫ থেকে ৭ টাকা, লাউ প্রকারভেদে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২০—২৫ টাকা, বাধাকপি ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি, শশা ৩০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচের কেজি ৫০—৬০ থেকে ৭০ টাকা।
শহরের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম ২৫—৩০ থেকে ৪০, বেগুন ৪০ থেকে ৫০, মুলা ১০ থেকে ২০, গাজর ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৬০ থেকে ৭০, টমেটো ৮০ থেকে ১০০ এবং নতুন—পুরোনো আলু ২০—২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে । প্রতি পিস ফুলকপি ও বাঁধাকপি ২০ থেকে ৩০ এবং আকারভেদে লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে সবজি নিয়ে এসেছেন সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের কৃষক ইসমাইল হেসেন। তিনি চার কেয়ার জমিতে ফুলকপি, পাতাকপি, টমেটো, ধনিয়াপাতা, আলু চাষ করেছেন।
জানতে চাইলে বলেন, দুই কেয়ার জমিতে ফুলকপি চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু, দামটা একেবারে কম। ১০—১২ মন ফুলকপি নিয়ে বাজারে এসেছি। পাইকার নেই। কেউ কেউ এসে ৫—৬ টাকা কেজি দর বলছেন। এই দামে বিক্রি করলে আমাদের কিছুই থাকবে না।
আমরা অনেক কষ্ট করে, চড়া দামে সার, বীজ, কীটনাশক কিনে এই ফসল উৎপাদন করেছি। এখন দেখছি পরিশ্রমের বিনিময়ে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান টানতে হবে। শহরের এই সবজি বাজারে এসে জায়গাও পাইনা। সবদিকেই কৃষকদের সমস্যা। পাইকাররা আসছে না। তারা এসে একবার দরদাম করে, পরে আর খবরই নিচ্ছেন না।
একই গ্রামের কৃষক গোলাপ মিয়া বললেন, কৃষকদের অবস্থা খুবই খারাপ। সবজি চাষ করতে গিয়ে যে খরচ করেছি। ক্ষেতে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহার করেছি। এই খরচটা উঠানোই কষ্ট হবে। সব সবজি একেবারে পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি সবজি বাজারে সবজি নিয়ে এসেছি। পাইকার নাই। সকাল থেকে বসে আছি। বিক্রি করতে পারছিনা।
বাজার করতে এসেছেন দেবজ্যোতি বাবু। তিনি, গাজর, টমেটো, ধনিয়াপাতা, আলু কিনেছেন। বললেন, সব সবজির দাম কম। খুব সস্তায় কিনেছি। তবে খুচরা সবজি বাজারে কেউ কেউ বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সবজি বাজারে বাজার করতে এসেছেন রিকশা চালক সাইফুল ইসলাম। হাতে একটি ব্যাগে আলু, মূলা, ফুলকপি, এবং কাঁচা মরিচ রয়েছে।
বললেন, শুনছি সবজির দাম কমেছে। কিন্তু, বাজারে এসে, ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচ ২০ টাকায়, আলু এক কেজি ২০ টাকায়, ফুলকপি এককেজি ৩০ টাকায় কিনেছি। দশ টাকার ধনিয়া পাতা কিনেছি। আমরা সবজি কিনলেই দাম বেশি। সব সমস্যা গরীবের। খুচরা বাজারে দাম বেশি।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব বলেন, কৃষকেরা কেন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। দামটা হঠাৎ করে কেন এতটা কমেছে, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব। কোনো ধরনের সিন্ডিকেট চক্র এর সাথে জড়িত রয়েছে কিনা, আমরা খতিয়ে দেখব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন