বাল্যবিবাহ মুক্ত জেলায় বিয়ের পিঁড়িতে ১১ বছরের শিশু

প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২৩:০৭

ভুয়া কাগজে সহজেই মিলছে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন

যে বয়সে সহপাঠীদের সাথে দুরন্তপনায় বেড়ে উঠার কথা, সে সময় বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষিত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এক বছর আগেও বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে বই আর খাতায় সময় কেটেছে শিশুটির। কিন্তু বিদায়ী বছরের ৯ ডিসেম্বর হয়ে যায় একই এলাকার মরছব আলীর ছেলে ইমন রহমানের ঘরের বধূ। 
বিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুযায়ী বিবাহিত ছাত্রীর বর্তমান বয়স ১১ বছর হলেও নিকাহ নামা ও জন্মনিবন্ধন বলছে ওই শিশু শিক্ষার্থীর বয়স ১৯। যে জন্মনিবন্ধন ইস্যু করা হয় বিয়ের ৫ দিন আগে কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদে। অথচ এর আগেই ২০২৩ সালে ভুক্তভোগীর ১ম জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। যেখানে তার জন্ম ২০১৫ সালে। প্রথম নিবন্ধনে থাকা সব তথ্য ঠিক রেখে শুধু শিশুর নামের সাথে দুটি অক্ষর যুক্ত করেই নতুন আরেকটি জন্ম নিবন্ধন দিয়েছে একই ইউনিয়ন পরিষদ। সেই জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন কাজী।


মাইজবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান জানান, ভুক্তভোগী শিশু ২০২৪ সালে ৪র্থ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, তার ভর্তির রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৫ সালে জন্ম। সে হিসেবে নিশ্চিত হয়ে বলা যায় বিয়ের বয়স হয়নি। শিশুটি যদি বিদ্যালয়ে আসতো আর আমরা জানতাম এমন ঘটনা সাথে সাথে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতাম। আমি সব সময় বিদ্যালয়ের অভিভাবক সমাবেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার বলি। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। 

 

 


দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলেও বিপত্তি বাধে বিয়ের পর। বিয়ের দেনদরবারে মনোমালিন্য হওয়ায় কনের বাবা দ্বারস্থ হন থানার। অপহরণ ও বাল্যবিবাহের অভিযোগে দায়ের করেন মামলা। সেই মামলায় বর ইমন রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

 


ভুক্তভোগী শিশুর পিতা বলেন, গ্রামবাসী ও সালিশের সবাইকে নিয়েই বিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে ছেলে পক্ষ সালিশ বা আমার কারো কথাই শুনে না। শালিশের কথা মতো পরে আমি গিয়ে থানায় অভিযোগ করি। পুলিশ আমার মেয়ে ও অভিযুক্ত ছেলে দুজনকেই নিয়ে যায়। পরে আদালত আমার মেয়েকে আমার হেফাজতে দেন আর ছেলেকে জেলে। এখন আবার গ্রামবাসীর মধ্যস্থতায় ঝামেলার সমাধান হয়েছে— শালীস যেভাবে বলে তাই করবো। 

 


সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো রতন সেখ বলেন, একজন বাবা এসে অভিযোগ করে তার ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে জোরপূর্বক ঘর থেকে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছে একই এলাকার ছেলে। প্রাথমিক তদন্তে বাল্যবিবাহের সত্যতা পেয়ে মামলা আমলে নেই। পরে ছেলেকে গ্রেফতার ও মেয়েকে হেফাজতে নিয়ে দুজনকে আদালতে উপস্থিত করি। এই ঘটনার তদন্তে গিয়ে অবাক করা তথ্য পাওয়া যায়। একটি জন্ম নিবন্ধন থাকার পরও ১১ বছরের মেয়েকে ১৯ বছর বানিয়ে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন দিয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ। কাজীও ছোট্ট একটা শিশুকে সরাসরি দেখেও বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। ন্যূনতম বুদ্ধি বিবেক কাজ করেনি কাজীর। এই ঘটনায় কাজী, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবার সবাই জড়িত। 

 


একটি জন্ম নিবন্ধন থাকার পরও অনলাইনে বয়স বাড়িয়ে কিভাবে হলো আরেকটি জন্ম নিবন্ধন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাই নিবন্ধনকারী কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদে। চেয়ারম্যানের কথা শুনে চক্ষু চড়ক গাছ!  শিশুর নামে আছে জাতীয় পরিচয়পত্র। এই প্রমাণক ও সংশ্লিষ্ট মেম্বারের স্বাক্ষরিত সুপারিশের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে নতুন জন্ম নিবন্ধন।
কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল বরকত বলেন, সব আবেদন হয় অনলাইনে। অনলাইনে আবেদনের পর আসে আমাদের কাছে। একজন বৈধ ট্যাক্স রসিদ, বয়সের জন্য প্রমাণক টিকা কার্ড,  শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা জাতীয় পরিচয়পত্র সহ আবেদন করলে আইন অনুযায়ী এই সেবা তার প্রাপ্য। আমরাও দিতে বাধ্য। এসবের ভিত্তিতেই জন্ম নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। যে কেউ যে কোন তথ্য দিয়ে আবেদন করলে যাছাই বাছাই করার প্রয়োজন কি নেই এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এই যাছাই বাছাই করেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার। আবেদনে তারও স্বাক্ষর আছে, এই দায় মেম্বারের। 

 


শিশুর নামে এনআইডি কার্ড! কিভাবে সম্ভব? তা জানতে এবার সেই এন আইডি কার্ড নিয়ে নির্বাচন অফিসে। নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেইজে পাওয়া গেলো না এই জাতীয় পরিচয়পত্রের কোন তথ্য। বাইরে কোথাও থেকে ভুয়া বানানো হয়েছে কার্ডটি জানালেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এহসান আহমেদ। 


ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রমাণক নিয়ে ফের হাজির হলাম কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদে। প্রমাণক দেখালে চমকে যান চেয়ারম্যান নিজেই। বললেন এই দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে তাদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর চিঠি লিখবেন। নির্দেশনা এলে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নিবেন। আবেদনকারী ও সনাক্তকারী মেম্বারকে পরিষদে তলব করে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। 

 


অন্যান্য সরকারি সংস্থার পরিসেবায় এনআইডি সম্পর্কিত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনলাইনে যাছাই হলেও গুরুত্বপূর্ণ জন্ম নিবন্ধন সার্ভারে নেই এই সুযোগ। যে কোন তথ্য দিয়েই করা যায় আবেদন। অন্য কোন কোন ভাবেও করা যায় না জাতীয় পরিচয় পত্র ভেরিফাই। যারা জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন, অনলাইনে তাদের নাম্বার স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হলে এই সুযোগে কেউ জালিয়াতি করতে পারবে না বললেন কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিতালি বেগম তালুকদার।

 


ভুয়া এই জন্ম নিবন্ধন আবেদনের সুপারিশে স্বাক্ষর করা সংরক্ষিত ওয়ার্ড মেম্বার ছকিনা বেগমের খোঁজে তার বাড়িতে গিয়ে পেলাম আরও অবাক করা তথ্য।  ভুক্তভোগী শিশু ও ছকিনার বাড়ির দুরত্ব ১০০ মিটারের বেশি নয়। প্রতিবেশী হওয়ায় শিশুটির জন্ম ও বংশ সম্পর্কে সব কিছুই জানা তার।  তবুও  ১১ বছরের শিশুকে ১৯ বছরের কিশোরী হিসেবে সত্যতা দিয়েছেন তিনি। ৩ দিন চেষ্টা করে বাড়ি, বাজার, পরিষদ এখানে সেখানে ঘুরিয়ে দেখা দিলেন না অভিযুক্ত মেম্বার ছকিনা বেগম। ফোনে বললেন, বাড়িতে বেশি থাকেন না তাই শিশুকে চিনতে পারেন নি। স্বাক্ষর নিতে কে আবেদন নিয়ে এসেছিল ১৫ দিনে সেটাও ভুলে গেছেন। 

 


মেম্বারের এমন অস্বাভাবিক কথাবার্তায় সন্দেহ হলে গ্রামে আরও খোঁজ নিয়ে বের হয় ভয়ঙ্কর সব তথ্য। স্থানীয়রা জানান, মেম্বার হয়েও সদর হাসপাতালে আয়ার কাজ করতেন ছকিনা। হাসপাতালে গিয়ে মিলে আরও বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ। দালালি সহ ভয়ঙ্কর অপরাধের সাথে জড়িত তিনি। অর্থের বিনিময়ে এমন কোন অনিয়ম নেই যা ছকিনা করেন নি। আয়ার যে পদে ডিউটি পালন করতেন সেই পদেও নিয়োগ নেই। আউটসোর্সিং প্রকল্পে নিয়োগকৃত মেয়ের প্রক্সি দিতেন ছকিনা। নানা অভিযোগে জড়িত থাকায় হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। 
ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক স্বাস্থ্য সেবী বলেন, নিয়োগ কিংবা প্রশিক্ষণ ছাড়াই গায়ের জোরে আয়ার কাজ করতো ছকিনা। কোনো ধরনের মেডিকেল জ্ঞান ছাড়াই  প্রসূতি রোগীদের চিকিৎসা করতো। যারা হাসপাতালে সেবা নিতে আসতো বকশিস কিংবা মিষ্টির কথা বলে জোর করে টাকা আদায় করতো। কেউ প্রতিবাদ করলে তার নামে উল্টা—পাল্টা কথা বলে সম্মানহানি করতো। তার অত্যাচারে রোগী ও হাসপাতালের কর্মীরা ভীত। তার আচরণ এতই খারাপ— মহিলা হয়ে আমাদের এক পুরুষ কর্মীকে সড়কের মাঝখানে মারধর করেছে। অশালীন আচরণ করে হুমকি দেয়। 

 


সকল অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে তত্ত্বাবধায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, ছকিনা বেগম নামের মহিলা হাসপাতালের দালালের তালিকাভুক্ত, তার নামে মামলাও করা হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালে নানাবিধ অনিয়ম করে বেড়াতো। 


মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পাঞ্চালি চৌধুরী বলেন, মাইজবাড়ির ঘটনা একটি উদাহরণ। শুধু এই একটি নয়, জেলায় অধিকাংশ ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি হয় বাল্যবিবাহের জন্য। যেখানেই বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে আমরা যাই গিয়ে দেখি হারিয়ে গেছে, করা হয় নাই নানা অজুহাতে বয়স বাড়িয়ে জন্ম নিবন্ধন করা হয়। বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যধি। এগুলো দমাতে এরকম ঘটনার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

 


স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মতিউর রহমান খান বলেন, জন্ম নিবন্ধন আইনের সুস্পষ্ট বলা আছে আবেদনের পর সেগুলো যাচাই—বাছাই করতে হবে। কোন সন্দেহ উদ্ভব হলে প্রয়োজনে গণশুনানি করবেন। এটি না করে কেউ যদি জন্ম নিবন্ধন দেন তা আইন বহির্ভূত। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন থেকে এই ঘটনার একটি চিঠি পেয়েছি। তদন্ত করে সত্যতা পেলে দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

 


১১ বছরের শিশুর বাল্যবিবাহের ঘটনায় বিচারিক ব্যবস্থা নিবেন আদালত। কিন্তু সঠিক তদন্ত ও আইনী ব্যবস্থা না নেয়া গেলে আড়ালে থেকে যাবে ভুয়া এনআইডির কারিগর ও তার সত্যতা দেয়া মেম্বারের মতো আসল অপরাধীরা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার