প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০০:০০
কৃষিজমিতে ধানের চারা রোপণে গিয়েছিলেন বশির মিয়া (৬০)। তার সঙ্গে ছিলেন পাঁচজন শ্রমিক। হঠাৎ কাচের বোতলের ভাঙা টুকরোর আঘাতে পা কেটে যায় বশিরের। গত ১৬ ডিসেম্বর সকালে তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরে দুর্ঘটনার শিকার হন এই কৃষক। ২২ দিন পেরিয়ে গেলেও কাটা পায়ের ঘা শুকায়নি তার।
উপজেলার বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নের বড়দল পুরানহাটি গ্রামের বাসিন্দা বশির মিয়া। তার গ্রামের পাশেই মাটিয়ান হাওর। সেখানে বর্ষা মৌসুমে সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকের ঢল নামে। নৌযানে অনেকেই মদ-বিয়ার পান করেন। খালি বোতল ছুড়ে ফেলেন। গত বুধবার বশির মিয়া বলেন, শুকনো মৌসুমে জমি চাষের সময় ফেলে যাওয়া বোতল ট্রাক্টরের চাপে ভেঙে যায়। অনেক সময় বোতল ভেঙেও ফেলে যান পর্যটকরা। এসব বোতলে স্থানীয় কৃষকদের পা কাটছে।
গত কয়েক দিনে উপজেলার অর্ধশতাধিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক ভাঙা বোতলের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে মাটিয়ান হাওরসংলগ্ন বড়দল গ্রামের বশির মিয়ার মতো একই গ্রামের ফজলুল বারি, ফয়জুন নুর, হালিম মিয়া, জুয়েল মিয়া, আব্দুর রব, সমসার হাওরসংলগ্ন শ্রীপুর গ্রামের কৃষক আলিম মিয়া, হারুন মিয়া, ট্যাকেরঘাট হাওরসংলগ্ন মাটিকাটা গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন, রইস মিয়াসহ অনেকেই আছেন।
কৃষক ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের ওপর সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জীবন-জীবিকার অনেকটাই এখন নির্ভর করে। তবে বেশির ভাগ পর্যটকই স্থানীয় পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি যত্নবান নন। পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে নানা ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বাসিন্দাদের।
ভরা বর্ষায় পর্যটকরা উপজেলার মাটিয়ান হাওর, বলদা হাওর, সমসার হাওর, ট্যাকেরঘাট হাওরসহ বিভিন্ন হাওর দিয়ে নৌকায় করে টাঙ্গুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী, ট্যাকের ঘাট, নীলাদ্রি লেকসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাতায়াত করেন। অনেকে ভ্রমণের আনন্দে নৌকায় বসে মদ-বিয়ার পান করেন। এসবের বোতল অনেকেই নির্জন হাওরের পানিতে ফেলে দেন। এছাড়াও তারা প্লাস্টিক-পলিথিনের মতো অপচনশীল দ্রব্যও ফেলে যান।
কৃষকরা জানিয়েছেন, বর্ষার শেষেই তাদের বোরো ধান রোপণের প্রস্তুতি নিতে হয়। জমি আবাদ করতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চষতে হয়। তখন কাচের বোতলগুলো ভেঙে জমির অনেক জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কাদামাটিতে কাচের টুকরো মিশে যাওয়ায় কৃষকের চোখে পড়ে না।
বড়দল গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, হাওরে জমি চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেক কৃষকের হাত-পা কাচের বোতলে কেটেছে। বশির মিয়ার পা কেটে যাওয়ায় তিনি ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে বাড়িতে বসে আছেন।
বড়দল দক্ষিণ ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, হাওরে কাজ করতে গিয়ে মদের বোতলের ভাঙা টুকরোর কারণে আমার গ্রামের ১০ জনের বেশি কৃষক হাত-পা কেটেছেন। বিষয়টি আমরা মেনে নিতে পারছি না।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজার ভাষ্য, প্লাস্টিকের বোতল ও কাচের বোতল পানিতে ফেলা উচিত নয়। এ বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন করতে তারা অনেক সভা-সেমিনার করেছেন। এ বছরও তারা ব্যাপক আকারে বিষয়টি নিয়ে প্রচার শুরু করবেন।
কাচের বোতলে কৃষকের আহত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলামও। তিনি বলেন, পর্যটকদের এমন আচরণ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে হাওরে কৃষি পরিবেশ ধ্বংস হবে। হাওর ভ্রমণে অবশ্যই সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
তাহিরপুরের ইউএনও মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, পরিত্যক্ত কাচের বোতলের ভাঙা অংশে কৃষকের ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার কথা শুনেছি। পর্যটকরা যেন অসচেতনভাবে প্লাস্টিক, পলিথিন ও কাচের বোতলের মতো অপচনশীল জিনিস যেখানে-সেখানে বা হাওরে না ফেলেন, সে বিষয়ে আমরা পর্যটকবাহী নৌচালকদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা করব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন