আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধেও কোটি টাকা বরাদ্দ!

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ২৩:১৭

শান্তিগঞ্জে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ

বর্ষায় বাঁধের উপর দিয়ে নৌকা চলাচল করায় ছোট ছোট পানির দাইড় বা খাল হয়েছে। এই পানির দাইড়কে বড় ভাঙন দেখিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। বাঁধের পাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা বলেছেন, ‘যারা হাওরে বাঁধ ব্যবসা করে আসছে, তারাই লুটপাটের সুবিধার্থে প্রাক্কলন তৈরি করার সময় অতিরিক্ত বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দেয়, তাতে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সকলেই লাভবান হয়। শান্তিগঞ্জ উপজেলার আস্তমা থেকে দেখার হাওরের দিকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধে এমন অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, বিষয়টি যাচাই বাচাই করতে কমিটি গঠন করা হবে।

 


শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের আস্তমা গ্রাম থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘের ফসল রক্ষা বাঁধ। এখানে সাতটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অথচ পুরো বাঁধের কোথাও অক্ষত আবারও কোথাও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষায় নৌকা চলাচল করায় এই বাঁধের একাধিক জায়গায় ছোট ছোট খাল আকৃতির ভাঙন হয়েছে। এসব খাল ভরাট ও সংস্কার করতে এবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৪১ লক্ষ ৬৯ হাজার টাকা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খাল ভরাট, সংস্কারসহ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ও অক্ষত অংশে এক্সকেভেটর দিয়ে উপরের মাটি তুলে আবারও বাঁধেই দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন মাটিও কিছু উপরে দেয়া হচ্ছে। 
হাওরে বাঁধ নির্মাণের আগে প্রি-ওয়ার্ক প্রক্কলন তৈরি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে কোটি টাকা বরাদ্দে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রাও।


বাঁধের পাশের গ্রাম আস্তমার বাসিন্দা মো. আব্দুল খয়ের বলেন, বর্ষায় হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে কেউ কেউ বাঁধ কেটে পানি ছেড়েছেন। পুরো বাঁধে এরকম দশটি পানির দাইর (পানি যাবার পথ) আছে। এই ভাঙনগুলোতে মাটি ফেলতে হবে। 

 


একই গ্রামের কৃষক সমুজ আলী। তিনি দেখার হাওরে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তিনি বললেন,  ‘গেল বছর বাঁধে ভাঙন বেশি ছিল, ওই সময় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবারও প্রায় একই বরাদ্দ হয়েছে। এতে বুঝা যায় ইস্টিমেট (প্রাক্কলন) তৈরির আগে সরেজমিনে আসা হয় নি। আসলেও গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। কিংবা বুঝে শুনেই টাকা লুটপাটের ধান্দা করা হয়েছে।’ 

 


তিনি বলেন, আমরা চাই সরকারি টাকার কম অপচয় হোক। একেক মানুষ একেক রকম। আমরা এসব কথা বললে অনেকে মনে করে আমরা বদনাম করছি। এতে পরে আরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়।

 


একই গ্রামের মোশাহিদ মিয়া বলেন, বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ একটি ভালো ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, এই অনিয়মের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীল কিছু লোকও জড়িত। তাঁর দাবি, বাঁধের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামতে যে অর্থ প্রয়োজন, বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এর প্রায় চারগুণ বেশি।

 


সুনামগঞ্জে এবার ৫৯৫ কিলোমিটার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন, অক্ষত ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে বরাবরের মতো পুরো বরাদ্দ  দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের অর্থের অপচয়সহ হাওরের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে।

 


হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, অক্ষত বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধেও পরিকল্পিতভাবে পূর্ণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। হাওরাঞ্চলে পরিকল্পনা করে দুর্নীতি করা হচ্ছে, যা আমরা আগেও  দেখেছি, এখনও দেখছি। তিনি বলেন, আমরা সরেজমিনে প্রতিটি হাওর পরিদর্শন করছি এবং দেখছি, অক্ষত বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে তথ্য প্রকাশ করছে, তা আমরা শুভংকরের ফাঁকি বলেই মনে করি।

 


বুধবার জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সামগ্রিক বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভায় অক্ষত বাঁধে কোটি টাকার বরাদ্দ কিভাবে দেওয়া হয়েছে জানতে চান গণমাধ্যমকর্মীরা। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া তাৎক্ষণিক শান্তিগঞ্জ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী কাছে ব্যাখ্যা চান।

 


এসময় উপসহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, টাস্কফোর্স মাপজোক করেছে। তারা এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। আমরা একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। টাস্কফোর্স যাচাই-বাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেবে। অক্ষত বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে পুরো বরাদ্দের বিষয়টি সার্ভে টিম ভালো বলতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 


জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, এবিষয়ে একটি কমিটি হবে। ওই কমিটির মাধ্যমে বাঁধের বরাদ্দ ঠিক আছে কিনা, বেশি না কম হয়েছে, সে বিষয়ে জেনে নতুন করে রি-ইস্টিমেট করা হবে। সেটা চূড়ান্ত করা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার