প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ২৩:০০
-ছবি. সুখবর
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। জেলার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অর্থাৎ, ৪টি উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসন। যে আসনে এখনো এক উপজেলার সাথে অন্য উপজেলা কিংবা এক ইউনিয়ন থেকে আরেক ইউনিয়নের নেই সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয় না হাওরের মানুষের ভাগ্য। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সমৃদ্ধ আসনটিতে রাজার বেশে এসে উন্নয়নের চেয়ে লুটপাটেই নজর ছিল সাবেক এমপিদের।
নির্বাচন আসে, সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু বদলায় না হাওরের মানুষের জীবনমান। কাক ডাকা ভোরে শান্তির ঘুম ভেঙে ক্ষেতে যাওয়া। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ঘরে ফেরা। বর্ষায় জেলে হয়ে পানির সাথে মিতালি। এটি হাওরের মানুষের জল-জীবিকার সংগ্রামের নিয়তি। হাওরের কাদা-পানিতেই পড়ে থাকে তাদের ভাগ্য। এখান থেকেই কুড়িয়ে নিতে হয় জীবনরসদ। কারণ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সৃষ্টি হয়নি উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান।
উন্নয়ন আর পরিবর্তনের আশ্বাস- প্রতিশ্রুতির ফুলজুড়িতে গত ১৭ বছরে উজাড় হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ। দেদারসে লুটপাট করেছেন বালুমহাল, জলমহাল। ঘাট-আঘাটের কর্তা বনে বাগিয়েছেন বস্তা বস্তা অর্থ। জেলার কৃষক-জেলের উন্নয়নের বরাদ্দেও ভাগ বসানো হয়েছে। বেহাল অবস্থা সড়কের। নানা অনিয়ম লুটপাটের শিরোনামে হাওরের হাঙর কিংবা ক্যাসিনো সম্রাট খেতাব পেয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ এমপিরা।
বাদাঘাটের বাসিন্দা ছিদ্দিক বললেন, আমাদের তাহিরপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত নাজুক, বিশেষ করে বাদাঘাট থেকে বাগলি যাওয়ার সড়কটি। বিগত ১৭ বছরে দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি সাহেবরা যদি আন্তরিকভাবে কাজ করতেন, তাহলে এই এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন সম্ভব হতো। কিন্তু তারা এগুলোর উন্নয়ন না করে তাদের পকেট ভারি করেছেন, টাকা তারা বিদেশে পাচার করছে। রতন এমপি বস্তার বস্তা টাকা নিয়ে কানাডা বাড়ি বানিয়েছে। এখন আমাদের প্রত্যাশা- যিনি নতুন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তিনি যেন বাদাঘাট-বাগলি সড়ক এবং বাদাঘাট বাজার-তাহিরপুর পর্যন্ত সড়কটি দ্রুত সংস্কার করেন। পাশাপাশি বিন্নাকুলী এলাকার সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা যাদুঘাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করেন।
.jpg)
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের গোলকপুর গ্রামের বাসিন্দা জমির হোসেন বললেন, আমরা হাওরাঞ্চলের মানুষ, আমাদের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো কখনোই পূরণ হয় নি। শিক্ষা খাতে আমরা চরমভাবে পিছিয়ে, আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে অনেক সময় বাড়ি থেকে রোগীকে উপজেলা সদরে নেওয়ার পথেই প্রাণ চলে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা অবস্থা এত খারাপ যে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে গিয়েও একজন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিগত বছরগুলোতে এমপিরা উন্নয়নের নামে ব্যাপক দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। রাস্তার উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা আনা হলেও সেসব অর্থ লুটপাট হয়েছে, বাস্তবে কোনো রাস্তাঘাট হয় নি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দেও হয়েছে অনিয়ম ও আত্মসাৎ। আমাদের শুল্ক স্টেশনগুলোতেও দুর্নীতি হয়েছে, নদী থেকে বালু-পাথর অবৈধভাবে লুট করা হয়েছে।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন থেকে সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ট্যাক্স পেলেও অবহেলার দিক থেকে আমরাই সবচেয়ে পিছিয়ে। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ এই ইউনিয়নে বসবাস করলেও একটি কার্যকর রাস্তাঘাটও নির্মিত হয় নি।
তিনি বলেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দরিদ্রতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে বিপর্যস্ত সুনামগঞ্জ- ১ আসনের মানুষ। কিন্তু প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ ও ভারতের সাথে সহজ যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে ঘোচানো যেত হাওরবাসীর দুঃখ। বেকারত্ব ঘুচিয়ে শিল্প ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারলেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতো তরুণ-যুবকরা।
তরুণ ভোটার রাফি আহমদ বলেন, সুনামগঞ্জ-১ আসনে যিনি এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তিনি যেন আমাদের এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। একইসঙ্গে আমরা যারা পড়াশোনা করছি, পড়াশোনা শেষ করার পর যেন নিজ এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাই- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বর্তমানে অনেক তরুণকে দূর-দূরান্তে চাকরি করতে যেতে হয়, যেখানে নানা ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যারা নির্বাচিত হবেন তারা যেন এই হয়রানি থেকে আমাদের রক্ষা করেন এবং আমাদের এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যাতে তরুণরা নিজ এলাকায় থেকেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
তরুণ ভোটার রুহান বলেন, আমি সহ আমরা যারা তরুণ ভোটার আছি, আমাদের একটাই প্রত্যাশা- আমাদের এলাকার শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হোক এবং একই সঙ্গে টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। বিগত সময়ে আমাদেরকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার বিন্দুমাত্র সুফল আমরা পাই নি। আমারা চাই, যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তারা যেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে প্রায়োরিটি দিয়ে কাজ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে হাওরে বইছে ভোটের হাওয়া। আবারও আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারের কাছে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। বেশি আশা বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের কাছে। পারবেন কি তারা হাওরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে?
এমন প্রশ্নে বিএনপি মনোনীত কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমি হাওর এলাকার কৃষকের সন্তান। আমি জানি এই এলাকার জন্য কি করতে হবে। আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুন্ন রেখে প্রথমে পরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে ধান রোপণ ও ধান কাটার সময় কৃষকদের যাতায়াত ও কাজকে সহজ করতে সাবমারসিবল সড়ক নির্মাণ করা হবে। আমাদের এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অনুন্নত অবস্থায় রয়েছে- এখানে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধাও নেই। এসব খাতকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে করার চেষ্টা করব।
এছাড়াও এ অঞ্চলে আরও শুল্ক স্টেশন স্থাপন, শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। যুবসমাজকে কর্মমুখী করতে পর্যটন শিল্পকে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে, যাতে এই এলাকার তরুণদের বেকারত্ব দূর করা যায়। এসব বিষয়কে সামনে রেখে আমাদের রয়েছে সুপরিকল্পিত নানা উদ্যোগ।
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ খান বলেন, হাওরাঞ্চলের একফসলি জমিগুলোতে যাতে সুষ্ঠুভাবে উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় এবং অকাল বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক ক্ষতি থেকে কৃষকদের রক্ষা করা যায়, সে লক্ষে টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি হাওরের ভেতরে যাতায়াতের সড়ক এবং উপজেলা সদরের সঙ্গে ইউনিয়নের অভ্যন্তরীন সংযোগ সড়কগুলোকে সাবমারসিবল সড়কের আওতায় এনে একটি কার্যকর ও টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ আর্থিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় বসবাস করছে। তাই এখানে বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। হাওরাঞ্চলে পর্যটন খাতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, এই খাতকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও সুসংগঠিত ও উন্নত করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। এসব লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চাই।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সমৃদ্ধ এই আসনে এবার ভোট দিবেন ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ১৭৯ পুরুষ, ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৪১ মহিলা ও ১০ জন হিজরা জনগোষ্ঠীর মানুষ। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা ছাড়াও এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন বই মার্কার নেজামী ইসলামী মনোনীত প্রার্থী।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন