পাউবো-পিআইসি ‘আঁতাতে’ অসমাপ্ত বাঁধের কাজ

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:৩৮

শান্তিগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধ

শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ছোট-বড় ১৬টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরে মোট হাওর রক্ষা বাঁধের প্রকল্পের সংখ্যা ৬৭টি। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সবগুলো প্রকল্পের আওতায় ৪৭.১২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করার কথা রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও শেষ হয়নি উপজেলার বেশ ক’টি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ। এতে আগাম বন্যার পানিতে ফসলহানির আশঙ্কায় রয়েছেন উপজেলার হাজারো কৃষক। শুধু শান্তিগঞ্জ উপজেলাই নয়, ফসলহানির শঙ্কা রয়েছে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, দিরাই উপজেলার হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি।

 


প্রতি বছর ডিসেম্বর শেষে জেলায় হাওর রক্ষার জন্য গঠন করা হয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। এসব কমিটিতে স্থান পান হাওরের কৃষকরা। কৃষকদের দ্বারা ফসল রক্ষা বাঁধ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে আনতে তদারকিতে থাকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাওবো) ও উপজেলা প্রশাসন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ উঠানোর কথা থাকলেও এখনো সম্পন্ন হয় নি অধিকাংশ বাঁধের কাজ। অভিযোগ উঠেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুব বেশি চাপ না থাকায় কাজে গাফিলতি করেছেন   প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসির) লোকজন। বাঁধ সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ তুলেছেন, পিআইসি ও পাউবোর মধ্যে গোপন আঁতাত হয়েছে। এজন্য কাজে গুরুত্ব দেয়নি পিআইসি। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলার সকল গণমাধ্যমকর্মীসহ সকলের দৃষ্টি ছিলো নির্বাচনের দিকে। বাঁধের কাজে নজরদারি কম থাকায় যাচ্ছেতাই কাজ করেছেন প্রকল্পের সদস্যরা, তদারকিও কম ছিলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এতে এক রকম নির্ভার ছিলেন পিআইসির লোকজন। তদারকি কেনো কম ছিলো? এমন প্রশ্নের জবাবে বাঁধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাওবো ও পিআইসিদের গোপন আঁতাতের কারণেই তদারকিতে গাফিলতি ছিলো। যদিও এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা।

 


২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা-আসামপুরের দেখারহাওর, বীরগাঁও ইউনিয়নের খাইহাওর, বাজার সংলগ্ন পাখিমারা হাওর রক্ষা বাঁধ ও দরগাপাশা ইউনিয়নের কাঁচিভাঙা হাওরর রক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঘাস লাগানোর কথা থাকলেও এখনো শেষ হয়নি বাঁধ সংস্কার বা মেরামতের কাজ। কোথাও কোথাও এখনো মাটি কাটার কাজ হচ্ছে। খাইহাওরের ৫৯ নম্বর পিআইসিতে এখনো মাটি একপাশে ফেলে রাখা হয়েছে, কাজ হচ্ছে না। ৬০ নম্বর প্রকল্পে বাঁধের উপরে এক্সেভেটর বসিয়ে জায়গার মাটি জায়গাতেই মিলানো হচ্ছে। পাখিমারা হাওর রক্ষা বাঁধের অবস্থা নাজুক। বাঁধে কিছু মাটি ফেলা হলেও সেই মাটিগুলোকে ড্রেসিং করা হয়নি, ঘাসও লাগানো হয়নি। দায়সারা কাজে অরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ এই ফসল রক্ষা বাঁধ।

 


কাঁচিভাঙা হাওরের বাঁধও বলতে গেলে অরক্ষিত। মাটি ফেলে উঁচু করার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর বাঁধ থেকে মাটি কেটে বাঁধের অন্য জায়গায় মাটি ফেলে উঁচু বাঁধকে আরও নিচু করা হয়েছে। জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা-আসামপুর গ্রামের উত্তরে দেখার হাওর রক্ষায় ৭টি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। এখানকার পাঁচটি প্রকল্প মাটি কাটার কাজ সম্পন্ন করলেও ঘাস লাগানো হয়নি এখনো। ১৮ ও ৩৩ নম্বর পিআইসি মাটি ড্রেসিং এর কাজ, ঘাস লাগানোর কাজ এখনো বাকী। এই প্রকল্পের স্লোবের কাজও ঠিক মতো হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। 

 


কাঁচিভাঙা হাওরপাড়ে হরিনগর গ্রাম। গ্রামের বাসিন্দা আজির উদ্দিন, মনসুর উদ্দিন, জাকার উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী। তারা বলেন, গত বছর আমাদের এই বাঁধে যে মাটি ফেলা হয়েছিলো সেই মাটি কেটে বাঁধের অন্য জায়গায় নিয়ে ফেলা হচ্ছে। বাঁধকে নিচু করা হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র একটি বেড়িবাঁধই নয়, আমাদের গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষের চলাচলের প্রধান সড়ক। যে সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কথা সে সময়ে শেষ হয়নি। কাজ দ্রুত শেষ করতে কোনো তাগাদা নেই। মূলতঃ উপজেলা লেভেলে কনভেন্স করেই চলছে হাওর রক্ষা বাঁধের দায়সারা কাজ।


খাইহাওরে হাঁসের খামার করেছেন কৃষক সাবেল মিয়া (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, এটাকে কোনো কাজ বলে না, জায়গার মাটি জায়গায় রেখে এক্সেভেটর দিয়ে মাটি খুঁড়ে জায়গাতেই সেটিং করা হচ্ছে। ভালো কাজ হচ্ছে না। সরকারি স্যারদেরও কোনো সময় আসতে দেখি না।

 


৬৩ নম্বর পিআইসির সাধারণ সম্পাদক আঙ্গুর মিয়া বলেছেন, আমরা পর্যাপ্ত টাকা পাইনি। মাত্র ১টি বিল দেওয়া হয়েছে। তবু কষ্টে-সৃষ্টে আমাদের কাজ আমরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি। হাওরে ঘাসের সংকট রয়েছে, তবু ঘাস লাগানোর চেষ্টা করছি। কারো সাথে আঁতাত করিনি, আমরা কাজ করে যাচ্ছি, কারণ হাওরের জমিগুলো আমাদের। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত আমাদের বিলটা যেনো দেওয়া হয়।  
যদিও এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া বলে দাবি করেছেন শান্তিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা তো পিআইসিদের ঠিকমতো টাকাই দিতে পারি না। তাদের হাতে টাকা থাকলে না তারা আমাদের সাথে আঁতাত করবে? এসব অভিযোগ মিথ্যা। টাকার জন্য অনেক পিআইসির কাজ করতে বিলম্ব হয়। আমরা আমাদের সিনিয়র স্যারদের বিষয়গুলো বার বার জানাই। বাঁধের কাজের ব্যপারে তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ আমরা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। অধিকাংশ বাঁধের কাজ শেষ। ঘাস সব জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ঘাস লাগাতে দেরি হচ্ছে। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সেটিও হয়ে যাবে। দু’একটি বাঁধ ছাড়া বাকী সব কাজই গুছিয়ে আনা হয়েছে। তবু আমরা মাঠে আছি। ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত আমরা মাঠেই থাকবো।

 


হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও পিআইসিদের মধ্যে আঁতাত থাকে। পাওবো কর্মকর্তারা আগে থেকেই কনভেন্স থাকেন। তাই তারা পিআইসিদের তাগাদা দেন না। তাদের সঠিক তদারকি থাকলে পিআইসিরা কাজ করতে বাধ্য। নিজেদের স্বার্থে চরিতার্থ করার জন্য তাদের মধ্যে লিয়াজো হয়ে যায়। এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহজাহানের সরকারি মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার