প্রকাশিত: ০৯ মার্চ, ২০২৬ ২৩:০৮
বৃষ্টি হওয়ায় জেলার বোরো ফসল এবং রবি শস্য ক্ষেত প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এতে করে কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। বৃষ্টিতে বোরো ধান, সরিষা, আলু, চিনা বাদাম, ভুট্টা সহ সবজি চাষে সজীবতা ফিরে এসেছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন কৃষকেরা। রবিবার রাতে জেলায় বৃষ্টির দেখা মিলে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে খরা থাকায় জেলার বিভিন্ন সড়কপথে যাতায়াতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ শহরের চার লেনের উন্নয়ন কাজের কারণে পুরো শহর ছিল ধুলোয় ধূসর। অন্যদিকে খরায় ফসলি জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টিতে সেই পরিবেশ আর নেই, জনজীবনে স্বস্তি ফিরেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন বৃষ্টি হওয়ায় বোরো ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সেচ খরচ অনেকাংশে কমেছে। বৃষ্টির পানি ফসলের গোড়ায় পৌঁছে প্রাকৃতিক সারের কাজ করছে এবং মরা ফসলে প্রাণ ফিরে আসবে।
কৃষকেরা জানান, সুনামগঞ্জ জেলা মূলত বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বোরো ধানের সবুজ চারায় ধান বের হওয়ার উপযুক্ত সময় চলছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় খরার কারণে অনেক সবুজ চারা লালচে হয়ে যাচ্ছিল। প্রায় এক মাস ধরে কৃষকরা অধীর আগ্রহে বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলেন। এর আগে উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের আঙ্গুলভাঙা মাঠে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও কৃষকদের উদ্যোগে বৃষ্টির জন্য বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত মুসল্লিরা মহান আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য কান্নাকাটি করে প্রার্থনা করেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেছেন- দেখা মিলেছে কাক্সিক্ষত বৃষ্টির। এতে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। বৃষ্টির ফলে গ্রীষ্মকালীন সবজির চারাগাছ তরতাজা হয়ে উঠবে। এই বৃষ্টি বোরো ও অন্যান্য রবি ফসলের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ, যা চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর। এরমধ্যে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টও অর্জিত হয়েছে। এদিকে শীতকালীন সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৬২০ হেক্টর।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামে খরচার হাওর ঘেঁষে শসা, লাউ, শিম, ভুট্টা, সহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছেন শামিম মিয়া এবং মো. নওশর মিয়া। ক্ষেত থেকে শসা তুলে বস্তায় ভরে সারিবদ্ধ করে রাখছিলেন তারা। উভয়ের চোখে মুখে ছিল হাসির ঢেউ। জানতে চাইলে শামিম মিয়া এবং নওশর মিয়া হাসিমাখা মুখে বললেন, গত রাতে বৃষ্টি হওয়ায় আমাদের ফসলের উপকার হয়েছে। একদিকে সেচ কাজে খরচ কমেছে। অন্যদিকে ফসলি জমিতে যে পোকামাকড়ের আক্রমণ ছিল, সেটাও কমেছে। বৃষ্টিতে কৃষিতে একটা সজীবতা ফিরে এসেছে। আমাদের মাঝে একটা স্বস্তি এবং শান্তি এসেছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।
জামালগঞ্জ উপজেলার লালপুর গ্রামের কৃষক রমজান আলী জানালেন, এবার ছয় বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করছেন। বৃষ্টি না হওয়ায় খরার কারণে চারাগুলো লালচে হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এতে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে বৃষ্টি হওয়ায় এখন আশা করছেন চারা থেকে ধান বের হবে।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে দেখা এনজিও কর্মী শরীফ উল্লাহ চৌধুরীর সাথে। তিনি একই সাথে একজন সফল কৃষকও। তিনি বলেন, গতকাল রাতের বৃষ্টিতে ফসলি জমির উপকার হবে। দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় বোরো ফসলি জমির মাটি ফেটে গিয়েছিল। এখন বৃষ্টি হওয়ায় ফসল ভালো হবে।
তিনি আরও বলেন, শহরে ৪ লেনের কাজ চলমান থাকায় ধুলোবালি উড়ে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল পথচারীদের। বৃষ্টির কারণে সেই পরিবেশ আর নেই, জনজীবনে স্বস্তি ফিরেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নির্বাহী সদস্য আব্দুর রব বলেন, বৃষ্টিতে হাওরের বাঁধের মাটি ভালোভাবে কম্পেকশন হবে। এতে মাটি শক্ত হবে এবং প্রকল্পের দুর্বাঘাস গজিয়ে উঠবে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শরিফ হোসেন বলেন, গতরাতে (রবিবার) বৃষ্টি হওয়ায় সবার মাঝেই শান্তি ফিরে এসেছে। জেলা শহরের চারলেনের কাজ চলমান থাকায় ধুলোময়লায় শহরটা অপরিচ্ছন্ন থাকত। বিশেষ করে আব্দুজ জহুর সেতুর সড়কের উপর দিয়ে বিশ্বম্ভরপুর এবং তাহিরপুর উপজেলায় যাতায়াতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ছিল। ধুুলো-ময়লায় সড়কপথ অন্ধকার হয়ে যেতো। এক পর্যায়ে মানুষজনকে জামালগঞ্জের সাচনা সড়কপথে ফতেহপুর হয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। বৃষ্টিতে একদিকে চলাচলে ভোগান্তি দূর হয়েছে এবং অপরদিকে আমাদের সুনামগঞ্জের একমাত্র বোরো ফসলে সজীবতা ফিরে এসেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠ কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জনি বলেন, বৃষ্টি বেড়িবাঁধ ও কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বৃষ্টির পর যেসব বেড়িবাঁধে ত্রুটি দেখা দেবে, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা হবে। বাঁধে বড় ধরনের ফাটল বা ধসে পড়ার মতো কোনো ঘটনা চোখে পড়ে নি।
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, বোরো ধানের জন্য এ মুহূর্তে বৃষ্টি অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। এই বৃষ্টির ফলে চারাগুলো থেকে ধান বের হতে সহায়ক হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা ফসল রক্ষা বাঁধ তদারকি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকীন নূর জানান, উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে এবং সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক। এই বৃষ্টিতে বোরো ধান ও বেড়িবাঁধের জন্য ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বৃষ্টির কারণে বাঁধের মাটি আরও শক্তভাবে বসবে। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জ হচ্ছে হাওর অধ্যুষিত একটি জেলা। এই জেলার অন্যতম ফসল হচ্ছে বোরো ধান। দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় খুবই সমস্যায় ছিলেন কৃষকেরা। বিশেষ করে যে সমস্ত জমিগুলোতে পানি দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, সেই জমিগুলো ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টিতে এই সমস্যা অনেকটাই কেটে গেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও এক দুইবার বৃষ্টি হলে খুব সুন্দর ভাবেই বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারবো। একইসাথে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লক্ষ মেট্রিকটন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও আমরা অর্জন করতে পারবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন