উভয় সংকটে কৃষক

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬ ২২:০৭

পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় হাওরজুড়ে ক্ষোভ

জেলার শস্যভাণ্ডার খ্যাত দেখার হাওরের একটি অংশের আবাদি জমি এখন ‘ডুবরার’ পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোনো জমির ধানের রেনু পর্যন্ত ডুবে আছে, কোনো জমির মাথা পর্যন্ত। কোমর সমান ডুবরা বা জলাবদ্ধতার পানিতে দিশেহারা স্থানীয় কৃষকরা। তারা বলছেন, অতি বৃষ্টির কারণে দেখার হাওরে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের যথেষ্ট ব্যবস্থা না করেই বিশাল উতারিয়া বাঁধ করা হয়েছে। এই মুহূর্তে হাওরটির ধান রক্ষায় ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে দেওয়ার দাবি কৃষকদের। তবে জেলা ও উপজেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বাঁধ কাটাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। এই অবস্থায় উভয় সংকটে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। মঙ্গলবার দুপুরে জেলার অন্যতম বৃহৎ ফসলরক্ষ বাঁধে সরেজমিনে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। 

 

 

 


বাঁধ কাটার দাবি শুধুমাত্র দেখার হাওরের কৃষকদেরই নয়, বিভিন্ন হাওরের কৃষকদের। শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁক, পশ্চিম বীরগাঁও, পূর্ব বীরগাঁও, দরগাপাশা ও পশ্চিম পাগলাসহ সবকয়টি ইউনিয়নের হাজারো কৃষকের ফসলি জমি এখন ডুবরায় ডুবে আছে। নীরবে, চোখের সামনেই নষ্ট হচ্ছে গর্ভবতী ধান গাছ। ২০/২৫ দিন পর যে ধান কেটে গোলায় তুলে আনন্দ মাতোয়ারা হওয়ার কথা কৃষকদের, সেই ধান এখন নষ্ট হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের অভাবে। বাঁধ কেটে দিতে প্রশাসন থেকে শুরু করে সব মহলেই কড়া নাড়ছেন কৃষকরা। অনেকটা নিজ উদ্যোগে বাঁধ কাটার অলিখিত তোড়জোড়ও শুরু করেছেন তারা। শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁকের জামাইকাটা হাওরের শৌলা, পাঙ্গাইস্যা, মাঝের কিত্তা ও নাওরীয়া এলাকার বিশাল অংশ পানিতে ডুবে আছে সোনার ফসল। পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াজুরী হাওরের সিফতখালী বাঁধ এলাকার ডুবরাতে মারাত্মক বিপাকে আছেন ঠাকুরভোগ, উফতিরপাড়, মৌখলা ও টাইলা এলাকার হাজারো কৃষক। দরগাপাশা ইউনিয়নের জামখলা হাওরেরও একই দৃশ্য। পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের শল্যার দাঁইড়, রাঙামাটি, পাখিমারা ও পুটিয়া এলাকাতেও ডুবরায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেক ধানী জমি। দেখার হাওরের বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর হুগানি, গুরাডুবা, ডাউক্কা, আলমপুর, আব্দুল্লাহপুর, মেলানী কিত্তা, বিটগঞ্জ, দড়িয়াবাজসহ অর্ধেকেরও বেশি জমি।

 


তবে বছরের এই সময়ে এসে কোনো অবস্থাতেই বাঁধে কোদাল লাগাতে রাজি নয় প্রশাসন। তারা বলছেন, এখন নদীর পানিও বেড়ে চলেছে। নদীর ভিতর থেকেও পানির চাপ বাড়বে। বাঁধ কাটলে আপাতদৃষ্টিতে উপকার হতে পারে, তবে পরবর্তীতে পুরো হাওরডুবির কারণও হতে পারে। তাই, আত্মঘাতী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এছাড়া যেসব বাঁধ একটু কম ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলোতে তো কৃষক, পিআইসি’র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির) সাথে কথা বলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেখার হাওরের ক্লোজারটি (উতারিয়া বাঁধ) অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি বিপজ্জনক।

 


মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত দেখার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, উথারিয়া বাঁধের মূল ক্লোজার থেকে থেকে ৫শ’ মিটার উত্তর পশ্চিম কোণের জমিগুলোতে পানি জমে আছে। দূর থেকে সবুজের সমারোহ মনে হলেও কাছে গেলেই দেখা যায় অর্ধেকেরও বেশি জমি ডুবে আছে পানিতে। যেদিকে চোখ যায়, সবুজের ফাঁকে ফাঁকে যেনো বড় বড় পানি সংরক্ষণের পুকুর। প্রতিটি জমিই অর্ধনিমজ্জিত হয়ে আছে ডুবরার পানিতে। যদিও মূল ক্লোজারের নিচে ৩টি পাইপ দেওয়া হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এই পাইগুলো পানি নিষ্কাশনের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। তাঁরা জানিয়েছেন, এক ঘন্টার বৃষ্টি হাওরে যে পরিমাণ পানি জমা হয়, এইসব পাইপে সেই পানি নিষ্কাশন হতে হলেও সময় লাগবে দু’দিন। যেহেতু চতুর্দিকে বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে পানি নিস্কাশনের পথ। তাই বাঁধ কেটে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।


তারা জানান, কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক ও দোয়ারাবাজার এলাকার শতাধিক মানুষ উথারিয়া ক্লোজারে এসেছিলেন বাঁধ কেটে দেওয়ার দাবি নিয়ে। খবর পেয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। দু’পক্ষের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলেও শেষমেষ কাটা হয়নি উথারিয়া ক্লোজার। জেলা প্রশাসন প্রশাসকের সাথে কথা বলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করার সিদ্ধান্ত হয় তখন।

 


দেখার হাওরের কৃষক মঈনুল ইসলাম, সিফাত আলী বলেন, আমরা প্রশাসনকে বলেছি, নদী থেকে হাওরে পানি বের করার জন্য যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সে দিকে জলাবদ্ধতার পানি বের হওয়ার একটা আধুনিত পদ্ধতি রাখা উচিত ছিলো। যখন দরকার পানি ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রেখে স্থায়ীভাবে বাঁধ তৈরির দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতি বছর বাঁধ তৈরির উদ্দেশ্য ভিন্ন। প্রশাসন, পিআইসির বাণিজ্যের জন্য এসব করা হয়। স্থায়ী সমাধানে যেতে হবে।

 


পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াজুরী হাওরের কৃষক নূর মিয়া, শিমুলবাক ইউনিয়নের জামাইকাটা হাওরের কৃষক আলা উদ্দিন, মো. কিবরিয়া ও আজিজুল হক বলেন, কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। যে জমি এখন শুকনা বা স্যাঁতস্যাঁতে থাকার কথা সে জমিতে ধানের উপর দিয়ে নৌকা চালানো হচ্ছে। কৃষকদের অবস্থা সূচনীয়। অতি দ্রুত বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্যালো ইঞ্জিন বা পাইপ দিয়ে অল্প পানি নিষ্কাশন করে লাভ হবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে হাওর থাকবে কিন্তু ধান থাকবে না। 

 


শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, আমরা কৃষকদের কথাই চিন্তা করছি। ৫—৬ তারিখে ঢল আসার আশঙ্কা রয়েছে। দেখার হাওর শান্তিগঞ্জের একার না। চারটি উপজেলার কৃষকের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। এর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৬৬ হেক্টর। এই জমির জন্য তো আর বাকী কৃষকদের জমিকে হুমকিতে ফেলতে পারি না? এছাড়া উপজেলার কাঁচিভাঙা হাওরসহ সব হাওরেরই একই চিত্র। বেশিরভাগ কৃষকের কথা ভেবে আমরা বাঁধ না কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে বিশেষ করে ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, কৃষক, পিআইসিসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 


জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, স্থানীয় মেম্বার, ইউপি চেয়ারম্যান, এসও, ইউএনও ও কৃষি কর্মকর্তাকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে—বাঁধ কাটা উচিত হবে কি না। তিনি আরও বলেন, বাঁধ কাটার আগে সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনায় নিতে হবে। আগামী ৬ তারিখে শুধু বাংলাদেশেই নয়, মেঘালয়েও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। যদি বাঁধ কেটে দেওয়া হয় ও দুই জায়গায় একসঙ্গে বৃষ্টি হয় হাওর ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। তাই পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে বাঁধ কাটা হবে, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের পর ৫—৬ তারিখের মধ্যেই আবার বাঁধ বন্ধ করা সম্ভব হয়—এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার