প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৩০
শাল্লার জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা
-ছবি. সুখবর
হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, মুখে ধোঁয়া। বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে অফিসকে শয়নকক্ষকে বানিয়ে ঘুষ লেনদেনের সভা বসিয়েছেন শাল্লা উপজেলা জনস্বাস্থ্য সহকারী প্রকৌশলী রাসেদুল ইসলাম। সরকারি অফিসে বিছানা পেতে রাজার হালে নেতাকর্মীদের নিয়ে আলাপ আলোচনায় বলছেন, ‘নির্দিষ্ট দিনের আগে টাকা না দিলে আমার (কর্মকর্তার) বাবাও এসে করাতে পারবে না কাজ। মসজিদের থেকে বেশি নিয়ে লাভ নেই তাই একটি সরকারি টিউবওয়েল বসাতে ১১ হাজার টাকা আর অন্যদের দিতে হবে ৩০ হাজার টাকা।’ অথচ এসব টিউবওয়েল ইউএনডিপির অর্থায়নে বিনামূল্যে দেয়ার কথা।
এমন একটি কথোপকথনের ভিডিও হাতে আসার পর কথা বলতে সরেজমিনে চলে যাই শাল্লা উপজেলায়। গিয়ে পাওয়া যায় অবাক করা সব তথ্য। যেন সরকারি অফিস নয় চালাচ্ছেন নিজের জমিদারি। মন চাইলে মাসে দুইমাসে আসেন অফিসে। না চাইলে আসেন না। অফিসের কর্মচারীরাও পায় না কর্মকর্তার নাগাল।
উপকারভোগী ও ভুক্তভোগী মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তালিকায় নাম থাকলেও টাকা না দেয়ায় অনেকের ভাগ্যে জোটেনি সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত টিউবওয়েল। যারা পেয়েছেন তাদের সবাইকে দিতে হয়েছে ২০-৩০ করে হাজার নগদ টাকা। কাউকে আবার টিউবওয়েলের পরিবর্তে হাজার দশেক টাকা দিয়ে সেই টিউবওয়েল বিক্রি করে দিয়েছেন অন্য কোথাও।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া গ্রামের ধীরেন্দ্র চন্দ্র দাসের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী বলেন, একটা টিউবওয়েলের জন্য তালিকায় আমাদের নাম আছে। কয়েকবার অফিসে গিয়েছে ঘরের মানুষ। তারা বলেছেন কিছু খরচপাতি লাগবে। আমরা এখনো টাকা দেইনি। এক বছর হয়ে গেছে টিউবওয়েলও পাইনি।
একই গ্রামের দক্ষিণ হাটির নয়ন চন্দ্র দাসের মা বলেন, আমার ছেলের নামের টিউবওয়েল। ছেলে বেশি একটা বাড়িতে থাকে না। টিউবওয়েল বসাতে সিকিউরিটি মানিসহ সব মিলিয়ে ২৫ হাজার টাকা নগদ দিয়েছি, এরপরে আরও খরচ হয়েছে।
কাশিপুরের তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সিকিউরিটি বাবদ ইঞ্জিনিয়ার স্যাররে ১৫ হাজার টাকা দিছি, এরপরে টিউবওয়েল পাইছি।
জয়দেব চন্দ্র দাস বলেন, টিউবওয়েল বাবদ রাশেদ মিয়াকে ১০ হাজার সিকিউরিটি টাকা দিছি। এরপর অফিস স্টাফ বিদ্যুৎ বাবু আরও টাকা নিয়েছে এসে। এরপর জানায় পাইপ মটর কিছুই নাই। সবকিছু নিজের টাকা দিয়ে কিনে এনে টিউবওয়েল বসিয়েছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই প্রকল্প ছাড়াও প্রকৌশলী রাসেদুলের অধীনে গত ৫ বছরে স্থাপন হয়েছে অন্তত ৪-৫ শত টিউবওয়েল। সেই হিসেবে একটি খাত থেকেই অবৈধ ভাবে কামিয়েছেন প্রায় কোটি টাকা। এসব অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে দিনভর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর অফিসে অবস্থান করলেও পাওয়া যায়নি তাকে। মোবাইল সব সময় বন্ধ থাকায় কর্মচারীরাও করতে পারেন না যোগাযোগ।
কাশিপুরের আবুল হোসেন বলেন, জনস্বাস্থ্য ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ১২ হাজার টাকা দিছি। ৫ বছরে আরও ২০ হাজার টাকা খরচ গেছে তবুও টিউবওয়েল পাইনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাল্লা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে গেলে বিদ্যুৎ বাবু সহ অফিসের দুই কর্মচারী জানান, ইঞ্জিনিয়ার স্যার আসেনি অফিসে, তিনি বাসায় আছেন। ফোন দিতে বললে অপারগতা প্রকাশ করে দুইজন বলেন স্যারকে ফোনে পাওয়া যায় না।
অফিসে না পেয়ে কর্মচারীদের তথ্যে সরকারি বাসায় যাওয়া। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পাওয়া না গেলেও তার অনুপস্থিতিতে বাসার দুই কর্মচারী হিতলাল ও সঞ্জয়কে পাওয়া যায়, উপজেলা শ্রমিকদল সভাপতি সহ অন্তত ৮-১০ জনকে সিন্ডিকেট সভা চালাচ্ছেন। সঞ্জয় জানান, তার পার্সোনাল সিন্ডিকেট সভা চলছে। কর্মকর্তা না থাকলেও তার অনুমতিতেই হচ্ছে। তবে কর্মকর্তা কোথায় তিনিও জানেন না। ভেতরে গোপন কক্ষ থেকে শার্টের বোতাম খোলা অপ্রস্তুত অবস্থায় বের হন আরও ৪-৫ জন। জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার এমন উদ্ধত কার্যক্রম ও অনিয়মের কঠোর সমালোচনা করে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কোথাকার কোন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা একদিনও অফিস করে না। বাসায় মানুষ নিয়ে আড্ডা দেয়। মানুষ সেবা নিতে গেলে বাণিজ্য করে। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।
বাধ্য হয়ে জেলা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার পর জানালেন লিখিত অভিযোগ পেলে নেয়া হবে ব্যবস্থা। জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ খালেদুল ইসলাম বলেন, আমি বার বার সভায় জানিয়েছি যে এগুলো বিনামূল্যে বিতরণের জন্য, যেন মানুষ জানে। এরপরও মানুষ টাকা দিলে তাদেরও সচেতন হতে হবে। যদি শাল্লা সহকারী প্রকৌশলী এরকম টাকা নিয়ে থাকেন তাহলে অবৈধভাবে নিয়েছেন। কেউ অভিযোগ করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে তাকে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন