প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:২৭
-ছবি. সুখবর
পঞ্চাশোর্ধ্ব মনু মিয়ার বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ এলাকায়। তার নেতৃত্বে ৯ জন ‘নাইয়া’ (ধান কাটার শ্রমিক) বাস থেকে নেমেছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। কারও হাতে ধান বহন করার জন্য বেতের তৈরি ছিক্কা (শিকা), কারো হাতে ভাড় বহনের জন্য অর্ধ বাঁশের তৈরি বেউ বা ভাড় বাঁশ, কারো হাতে তাল পাতার তৈরি মাথায় দেওয়ার ছাতা। প্রায় সকলের কাঁধেই ব্যাগে পরিধেয় কাপড়। তাদের যাত্রা উপজেলার বীরগাঁও ইউনিয়নে। উদ্দেশ্য ধান কাটা। বীরগাঁও গ্রামের একজন কৃষক তাদেরকে আনিয়েছেন। হাওরের কাঁচা ধান পাকতে শুরু করেছে। দুই-চারদিনের মধ্যেই কাটা শুরু করবেন তিনি। পূর্ব প্রস্তুতির বড় অংশ হিসেবে ধান কাটার শ্রমিকের ব্যবস্থা করেছেন বীরগাঁওয়ের ওই কৃষক। ধান কাটার শ্রমিকের স্থানীয় নাম ‘নাইয়া’। নাইয়ারা মাসব্যাপী কাজ করবেন পাখিমারা, রাঙামাটি, পুটিয়াসহ বিভিন্ন হাওরে। বাড়ি ফেরার সময় ট্রাক ভর্তি করে ধান নিয়ে বাড়ি ফিরবেন তারা।
কারও পকেটে থাকবে নগদ টাকাও। এদিকে উপজেলায় বোরো ধান ঘরে তুলতে একশোর বেশি হারভেস্টার মেশিন মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি কার্যালয়। কৃষি অফিসের আওতাধীন ৭৭টি ও ব্যক্তিগত প্রায় ৫০টি হারভেস্টার মেশিন ধান কাটবে এবছর।
শুধু বীরগাঁওয়েই নয়, আস্তে আস্তে উপজেলার আরও বিভিন্ন হাওর এলাকায়ও আসবেন নাইয়ারা। গত কয়েক বছরে বাইরের এলাকা থেকে নাইয়াদের আগমন খুব একটা দেখা যায়নি। স্থানীয় শ্রমিক আর হারভেস্টার মেশিনেই কাটা হয়েছে ধান। এ বছর নাইয়া আসার কারণ হিসেবে হাওরে পানি থাকাকেই চিহ্নিত করেছেন অনেক কৃষক। কৃষকরা জানিয়েছেন, হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটলে কৃষকদের যেমন সুবিধা আছে তেমনি অসুবিধাও আছে। একদিকে যেমন গো-খাদ্য হিসেবে খড় পান না, তেমনি জমিতে সামান্য পানি হলেও সেই মেশিন আর পানিতে নামানো যায় না। এমন পরিস্থিতিতে গভীর হাওরেও নেওয়া যায় না হারভেস্টার মেশিন।
কৃষি অফিস জানিয়েছে, জমিতে ৮ইঞ্চি পানি থাকলেও হারভেস্টার মেশিন ভালো করে কাজ করতে পারে। মূলত, কৃষকরা সনাতনী পদ্ধতি অর্থাৎ শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে বেশি আগ্রহী হন খড় পাওয়ার জন্য। গবাদিপশু পালন করতে বিশেষ করে বর্ষায় এই খড় তাদের খুবই প্রয়োজনীয়।
এ বছর উপজেলার বিভিন্ন হাওর ও নন-হাওরে চাষ করা হয়েছে ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর বোরো জমি। শুধু হাওরেই আছে ১৮ হাজার ৩৮১ হেক্টর। দেখার হাওরের শান্তিগঞ্জ অংশে চাষাবাদ হয়ে ৩ হাজার ৫শ’ হেক্টর। পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে কৃষকের অনেক জমি। যেসব জমিতে পানি জমে আছে সেসব জমি কাটতে হলে কোনো অবস্থাতেই হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। এ জন্য বিকল্প হিসেবে নাইয়া নিয়ে আসছেন অনেক কৃষক। এতে ধান কাটতে যেমন খরচ বেশি হবে, তেমনি সংকট দেখা দিবে শ্রমিকের। অন্যদিকে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটতে প্রতি ৩০ শতক জমিতে ১৯০০ টাকা নেওয়ার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এখানে ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে কৃষক মুখে। তারা বলছেন, এখন বৈশ্বিক পরিস্থিত খারাপ। তেলের সংকট। হারভেস্টার মেশিন চালাতে প্রতিদিন অনেক তেল লাগে। তেলের দাম বৃদ্ধি ও তেল সংকটের কারণে কোনো অবস্থাতেই ১৯০০ টাকায় ধান কাটা সম্ভব নয়। এ নিয়েও একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হবে।
শান্তিগঞ্জ কৃষি কার্যালয় জানিয়েছে, ১ বৈশাখ পর্যন্ত উপজেলায় মোট ৯৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সকল কৃষকের উচিত কোনো জমির ধান ৫০ শতাংশ পেকে গেলে অবশ্যই কেটে ফেলতে হবে।
শান্তিগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব বলেন, এ বছর একশোরও বেশি হারভেস্টার মেশিন হাওরে ধান কাটবে। ৭৭টি উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং প্রায় ৫০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। নাইয়াদের যারা আনেন তারা মূলত গোখাদ্য সংগ্রহ করতে চান। খড়ের প্রয়োজনে তারা সনাতনী পদ্ধতিতে ধান কাটান, আর কিছু না। এ বছর ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর বোরো জমি। শুধু হাওরেই আছে ১৮ হাজার ৩৮১ হেক্টর। দেখার হাওরের শান্তিগঞ্জ অংশে চাষাবাদ হয়ে ৩ হাজার ৫শ’ হেক্টর। আমরা কৃষকদের অনুরোধ করে বলবো, ৮০ শতাংশ ধান পাকা হয়ে গেলে অবশ্যই কেটে নিতে হবে। জেলা প্রশাসন হারভেস্টার খরচ কেয়ার প্রতি ১৯০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ পর্যন্ত শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৯৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া ভালো। আশা করছি শতভাগ ফসল তোলা সম্ভব হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন