প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২৩:১৫
দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার সময় শনিবার দুপুরে বজ্রঘাতে এক কলেজ শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। প্রতিবছরই এ ধরনের অকাল মৃত্যু ঘটলেও প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। দায়িত্বশীলরা বজ্রঝড়ের আগাম বার্তা ও নিরাপদে থাকার বিভিন্ন কৌশল প্রচারের কথা বললেও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, তারা এমন কোনো প্রচারণা দেখেন নি।
শনিবার চাচার সঙ্গে ধর্মপাশার টগার হাওরে বোরো ধান কাটতে যান বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হবিবুর রহমান। জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা জমিতে ধান কাটতে কয়েকজন নৌকায় করে সেখানে যান। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে সবাই ধান কাটছিলেন। হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে এবং বজ্রপাত শুরু হয়। বাড়িঘর কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকায় সবাই নৌকায় উঠে আশ্রয় নেন। এ সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তারা সবাই আক্রান্ত হন।
হবিবুর রহমানের সঙ্গে থাকা চাচা মো. সাইদুর রহমান জানান, ধান কাটার সময় হঠাৎ ঘুর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ক্ষেত থেকে বাড়ি দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হওয়ায় তারা নৌকায় উঠে বসে ছিলেন। হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হলে কিছুক্ষণ কী ঘটেছে তা বুঝতে পারেননি। পরে তিনি দেখেন, হবিবুর রহমান পানিতে পড়ে গেছে। তখনই বুঝতে পারেন তার শ্বাস নেই। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি আরও বলেন, হাওরের ওই জনমানবশূন্য এলাকায় আশয়কেন্দ্র অত্যন্ত প্রয়োজন। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোনো বাড়িঘর নেই। এমন পরিস্থিতিতে আশ্রয় নেওয়ার মতো নিরাপদ স্থাপনা থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
বড়ইহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফরহাদ হোসাইন বলেন, হবিবুর রহমান সাবেক শিক্ষার্থী ছিলো এবং বর্তমানে কলেজে পড়াশোনা করছিলো। শনিবার বজ্রপাতে তার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি জানান, পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। তাই এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা জরুরি।
একই উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতিপুর ইসলামপুর গ্রামেও বজ্রপাতে জয়নাল হকের ছেলে রহমত উল্লাহ মারা গেছেন। এছাড়াও জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরুজ্জামান, দিরাই উপজেলার চরনাচর ইউনিয়নের পেরুয়া আশনাবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে লিটন মিয়া ও তাহিরপুর উপজেলার জামলাবাজ গ্রামের আবু বকরের ছেলে আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া একই সময়ে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
দায়িত্বশীলরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখার সাথে সাথে অবহেলা না করে দ্রুত কোনো পাকা দালানে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। যদি বিদ্যুৎ চমকানো এবং মেঘের গর্জনের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ৩০ সেকেন্ডের কম হয় তবে বুঝতে হবে বজ্রপাত খুব কাছেই আঘাত হানবে। খোলা মাঠে কাজ করার সময় মেঘের ডাক শুনলে হাতের কাছে থাকা কাস্তে, ছাতা বা মাছ ধরার জালের মতো ধাতব সরঞ্জামগুলো নিজের শরীর থেকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। হিজল বা করচ গাছের মতো বড় এবং একাকী দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু গাছের নিচে কখনোই আশ্রয় নেওয়া যাবে না, কারণ বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুুকে আগে আঘাত করে। যদি নিরাপদ কোনো ঘর খুঁজে না পাওয়া যায় তবে মাটির ওপর শুয়ে না পড়ে দুই পা একসাথে করে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নিচু করে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরতে হবে। যাতে শরীরের সাথে মাটির সংযোগ কম থাকে। নৌকায় থাকা অবস্থায় দ্রুত পাড়ে ফেরার চেষ্টা করতে হবে এবং তা সম্ভব না হলে নৌকার ছৈ বা ছাউনির নিচে হাত-পা গুটিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকতে হবে কিন্তু কোনোভাবেই লগি বা পানি স্পর্শ করা যাবে না। শেষবার মেঘ ডাকার পর অন্তত ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঘরের বাইরে বের হওয়া ঠিক নয় কারণ ঝড়ের রেশ কেটে গেলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে যায়।
জেলা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে ২০২২ সালে ৬ জন, ২০২৩ সালে ২৯ জন, ২০২৪ সালে ১১ জন ও ২০২৫ সালে ১৫ জন মারা গেছেন। এই ৪ বছরে প্রায় ৬১ জন কৃষক মারা গেছেন। যাদের সবাইকে নীতিমালা অনুযায়ী সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেকে মারা গেছেন, যাদের তালিকা তাদের কাছে নেই বলে জানানো হয়েছে।
পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনার বেশি এর অন্যতম কারণ পরিবেশ বিপর্যয়। সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি হলেন একেএম আবু নাছার বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য গাছ কাটা ও পৃথিবীর উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরির্তন হয়েছে, এতে বজ্রপাতের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এজন্য আমাদের পরিবেশের প্রতি যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষককে সচেতন করতে হেবে।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, বৃষ্টিপাতের পূর্বাবাস তারা ৪ থেকে ৫ দিন পর পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। বজ্রপাতের কোনো অগ্রিম বার্তা তারা পান না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের থেকে প্রাপ্ত বার্তা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌচ্ছানো হয়। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এধরণের কোনো অগ্রিম বার্তা তারা পান না।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নের গড়াকাটা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, হাওরে ধান চাষ করায় ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, ফসল কেটে ঘরে তুলতেই হয়। বৈশাখ মাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। তিনি জানান, আগে থেকেই যদি বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস পাওয়া যেত, তাহলে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারতেন। কিন্তু কৃষি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকেই আগাম এ ধরনের তথ্য বা সতর্কবার্তা দেওয়া হয় না।
সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সহকারী সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জ জেলায়। এজন্য বজ্র দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে সুনামগঞ্জকে ঘোষণা প্রদান করতে হবে। প্রতিবছরই আমাদের কৃষক ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে শিকার হয়ে প্রাণ হারান। মৌসুমের শুরুতেই ৫ কৃষকের প্রাণ গেছে। এটি বন্ধ করতে সরকারের করণীয় আছে। এজন্য প্রয়োজনীয় বজ্র নিরোধক স্থাপন করতে হবে। হাওরের একদম মাঝে, যেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বাড়িঘর সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে শুধু বিনোদনে জন্য নয়, প্রকৃত অর্থেই কৃষকের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এসব বানাতে হবে।
তিনি বলেন, মোবাইলে আবহাওয়া বার্তা কিভাবে জানতে হয় কৃষক জানেন না। আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়ার অগ্রিম খবর কৃষকদের মাঝে পৌচ্ছাতে হবে। বজ্রপাত শুরু হলে করণীয় সম্পর্কে কৃষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এসব শুধু কাগজে কলমে যেনো সীমাবদ্ধ না থাকে।
তিনি আরও বলেন, কেউ মারা গেলে মাত্র ২৫ হাজার টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়। আহতদের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার, যা অন্তত অপ্রতুল। কৃষক দেশের খাদ্য সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেন, এজন্য নিহত পরিবারের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এবার দেরিতে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং মে মাসের শেষ নাগাদ পুরো ধান কাটা শেষ হওয়ার কথা। তিনি জানান, এই সময়ে তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে আবহাওয়ার তথ্য পান, যা চার থেকে পাঁচ দিন পরপর সরবরাহ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বৃষ্টিপাত ও আগাম বন্যার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সতর্ক করা হয়, যাতে তারা সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান ডিও বলেন, আমাদের ২৩-২৪ অর্থ বছরে ৬ টি উপজেলায় ১৮টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। জনবহুল এলাকায় এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যে বজ্রপাতের মৃত্যুর খবর পাচ্ছি সেগুলো মাঠে ও খোলা জায়গায় হয়। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা জরুরী। এছাড়াও হাওরে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে কিছু শেড নির্মাণ করা হয়েছে। লজিক প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের জিআর ক্যাশ থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শনিবার যারা মারা গেছেন তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সহায়তা প্রদান করা হবে।
এদিকে রবিবার বিকালে জাতীয় সংসদে বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের অনুমতিক্রমে কামরুল বলেন, প্রতিবছর হাওরে কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, যা রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, একটি হাওরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। তাই হাওরাঞ্চলে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন