ত্রিমুখী বিপদ, ত্রিশঙ্কু দশা

প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৩২

-ছবি. সুখবর

জামালগঞ্জ উপজেলায় বিস্তীর্ণ হাওর জুড়ে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও আনন্দের বদলে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ত্রিমুখী সসম্যা। আগাম বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে বেশিরভাগ নিচু জমি। এতে পাকা ধানের মাঠ জুড়ে ক্ষতির চিত্রই বেশি। তাদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট, জ্বালানি তেলের অভাব এবং শিলাবৃষ্টি। সব মিলিয়ে ধান কাটার শুরুতেই বাড়তি খরচ ও কাটা-মাড়াইয়ের অনিশ্চয়তার চাপ নিয়ে হাওরের ফসল তুলতে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

 


জমিতে পানি থাকায় অনেকেই হারভেস্টার মেশিন নিতে পারছেন না। ফলে শ্রমিকের জন্য ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। আবার অনেক মেশিন মালিক হারভেস্টার চালানোর তেলও পাচ্ছেন না। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর উপজেলায় ছোট-বড় হাওর মিলিয়ে ২৪ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য ৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। গত এক সপ্তাহ ধরে কৃষকেরা ধান কাটতে শুরু করেছেন। তবে গত পনেরো দিন ধরে দিনে রোদ ও রাতে বৃষ্টির কারণে হাওরের বেশিরভাগ নিচু জমিতে পানি জমে এক-চতুর্থাংশ ফসল ডুবে গেছে।

 


সরকারি হিসেবে ৪৯১ হেক্টর জমির কাঁচা ও পাকা ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষকদের মতে, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। যেসব জমিতে পানি জমেছে, সেখানে কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা সম্ভব নয়।
ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান কাজল চন্দ্র তালুকদার বলেন, পাগনার হাওরের প্রায় ৫০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে গেছে। যেসব জমিতে ধান টিকে আছে, সেগুলোতেও মেশিন দিয়ে ধান কাটা যাবে না। বাধ্য হয়ে শ্রমিক দিয়ে কাটাতে হবে, এতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে।


কামধরপুর গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, প্রতিদিন রাতে মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। অতিবৃষ্টিতে আগাম বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ এখন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁধ কাটতে হচ্ছে। বড় বৃষ্টি হলে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 


তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত বন্যার আশঙ্কা নেই। কিন্তু বড় ধরনের বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে মাঝারি বা হালকা বৃষ্টি হলেও বড় বন্যার সম্ভাবনা নেই।
কৃষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো- সরকারিভাবে ধানের মূল্য নির্ধারণ ও ক্রয় কার্যক্রম শুরু না হওয়া। ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজনের কাছে ধান বিক্রি করছেন। বর্তমানে প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম।

 


নাজিমনগর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, তিনি প্রায় ২০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। কিন্তু ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাচ্ছেন না। হারভেস্টার চালকরাও তেল পাচ্ছেন না। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে শিলাবৃষ্টিও হয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি ত্রিমুখী বিপদে আছেন।


বেহেলি ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের কৃষক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি জমেছে, শ্রমিক সংকট রয়েছে, আর সবাই একসঙ্গে ধান পাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে। যেসব শ্রমিক পাওয়া যায়, তাদের মজুরি বেশি, আবার দক্ষতাও কম।

 


তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন জেলা থেকে ধান কাটার শ্রমিক আসত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে হারভেস্টার ব্যবহারের কারণে তারা আর আসে না। এখন জলাবদ্ধ জমিতে মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক কৃষকেরা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেন। মৌসুমের শুরুতেই ঋণ পরিশোধের জন্য কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। তাই তিনি সরকারের কাছে ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের দাবি জানান।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, বিভিন্ন জলাশয় পলিমাটিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ফসলের কিছু ক্ষতি হয়েছে। পাম্প ও বিদ্যুৎচালিত মোটর দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হলেও বৃষ্টির কারণে আবার পানি জমছে।

 


তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্টার ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকও তুলনামূলকভাবে কম এবং অনেকে দক্ষ নন। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল ঘরে তুলতে পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
হারভেস্টার মালিকদের প্রতি মেশিনে ১০০ লিটার করে জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং কৃষকদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী বছর কানাইখালী নদী খনন না করা হলে প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার