রাবার ড্যামের প্রত্যাশায় কৃষক-গ্রামবাসী

প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:২৬

-ছবি. সুখবর

শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা এবং আসামপুর গ্রামের দূরত্ব প্রায় ২৫০ মিটার। দুই গ্রামকে দ্বিখণ্ডিত করেছে মহাসিং নদী। নদীটির উৎপত্তিস্থল সুনামগঞ্জের শস্যভাণ্ডার খ্যাত দেখার হাওরে। হাওর ঘুরে উথারিয়া ক্লোজার হয়ে স্থলপথে আস্তমা থেকে আসামপুর যেতে ঘুরতে হয় সাড়ে ৫ কিলোমিটার পথ। দেখার হাওরে ৪টি উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর বোরো জমি রক্ষা করতে এই সাড়ে ৫ কিলোমিটার নদীর পাড়ে দিতে হয় ফসল রক্ষা বাঁধ। প্রয়োজন অনুযায়ী কমাতে বাড়াতে হয় প্রকল্প। এবছর ৭টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। প্রতি বছর এ পরিমাণ বরাদ্দ দিতে হয়। ধান তোলার মৌসুম শেষ হলে বর্ষায় লোকচক্ষুর আড়ালে কোথাও কোথাও ভেঙে দেওয়া হয় বাঁধ, হাওরের বড় বড় আফালে ‘ওয়াশ আউট’ হয় বাঁধগুলোর প্রায় সকল মাটি। পরের বছর আবারও সংস্কার করতে হয় এগুলো। প্রতি বছর খরচ হয় বিপুল পরিমান সরকারি অর্থ। অস্থায়ী প্রকল্পে সরকারের এতো এতো টাকা খরচ হচ্ছে অথচ সরকার স্থায়ী কোনো চিন্তা করছে না কেনো? এমন প্রশ্ন ছিলো সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের মাঝে। অথচ একটি মাত্র প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে একদিকে যেমন প্রতি বছরের খরচ কমে আসতো তেমনি নিশ্চিন্তে বৈশাখী ধান গোলায় তুলার কাজ করতে পারতেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। 

 

কী সেই প্রকল্প? এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজেছেন সুনামগঞ্জ জেলায় নতুন যোগদান করা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। গত বুধবার দেখার হাওরের উথারিয়া বাঁধের অংশ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ‘নয়া’ এই জেলা প্রশাসক। স্থানীয় কৃষকদের কথা গুরুত্বসহকারে শুনেছেন তিনি। চেষ্টা করেছেন দেখার হাওরের ফসল ডুবির স্থায়ী সমাধান খোঁজার। কৃষকরা তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি হচ্ছে আসামপুর-আস্তমা অংশে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা। এই অংশে যদি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা যায় তাহলে ইচ্ছে মতো নদীর পানি ধরে রাখা যাবে এবং ছেড়ে দেওয়া যাবে। তখন খুব সহজে আর দেখার হাওর ডুববে না এবং বছরে সাড়ে ৫ কিলোমিটারে কোটি-দেড় কোটি টাকা বরাদ্দও দিতে হবে না। কৃষকদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফেরার পথে আস্তমা-আসামপুর অংশও পরিদর্শন করেন তিনি। উপস্থিত সময় অর্ধশতাধিক জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ কৃষকদের সামনে রাবার ড্যাম স্থাপনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন তিনি। এটি স্থাপন করতে কোনো নেতিবাচক দিক আছে কী না তা যাচাই করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডেও নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ জাহান এসময় জানান, এর আগে তারা রাবার ড্যাম স্থাপনের পক্ষে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।

 

 

প্রশাসনের এমন ইতিবাচক উদ্যোগে প্রোজ্জ্বল স্থানীয় কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তারা জানান, এটি তাদের দীর্ঘ দিনের দাবি। এখানে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ হলে শুধু যে হাওরের ফসল রক্ষা হবে তা নয়, সড়ক পথের যোগাযোগ স্থাপন হবে এক ওয়ার্ডের দুই গ্রামবাসীর মধ্যে। এতে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে যেমন বাড়বে আন্তরিকতা, তেমনি যোগযোগ ব্যবস্থায় সারা জীবন ধরে পিচিয়ে থাকা গ্রাম আসামপুর নৌকা ছেড়ে গাড়িতে করে তাদের বাড়ি পৌঁছানোর স্বপ্নও বাসতবায়ন হবে। গতি ফিরবে জীবনমানে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে উন্নতি ঘটবে।

 

আসামপুর গ্রামের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী অলিমা আক্তার, শাহিনা বেগম, নবম, শ্রেণির নাছুহা জান্নাত ও সিয়াম আহমদ বলেন, আমরা পড়াশোনা করি পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজে। এই যে এখন বর্ষাকাল আসছে। সামান্য বৃষ্ট হলেই নৌকা ছাড়ে না। সময় মতো স্কুলে গিয়ে পৌঁছতে পারি না বলে অনেক বখা খেতে হয়। নৌকায় দীর্ঘ পথ। যদি এখানে রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয় এবং যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয় তাহলে আমাদের জীবনমান বদলে যাবে। রাস্তা না থাকায় একজন ভালো টিউটর আমরা পাই না। তাই মাননীয় এমপি স্যারগণ, ডিসি স্যারসহ সকলের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন যেনো আমাদের কথা চিন্তা করে এবং হাওরের কৃষকদের ধানের কথা চিন্তা করে অতি দ্রুত আমাদের এখানে রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়। জেলা প্রশাসন থেকে এই উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

 

আসামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পাগলা বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম, হুমায়ুন কবির ও লোকমান হোসেন বলেন, ডিসি স্যার, আমাদের এমপি মহোদয় রাবার ড্যাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন শুনে আমরা খুব খুশি। মূলত: কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আমাদের গ্রাম ও আস্তমা পুরোপুরি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষি বাঁচলেই আমাদের গ্রাম বাঁচবে। বেরিবাঁধ প্রথা এখান থেকে উঠে যাবে। বাঁধ বাঁধতে যে মাটি ও ঘাস লাগে সেই মাটি ও ঘাস এখন হাওরে নেই। সবেিদক অসুবিধা। তাই এখন সময়ের দাবি, আসামপুর-আস্তমা অংশে মহাসিং নদীতে রাস্তাসমেত া রাবার ড্যাম কাম সেতু নির্মাণ করতে হবে। 

 

আস্তমা গ্রামের একাধিক কৃষকের দাবি, এতদিনে প্রশাসনের কানে আমাদের আর্জি পৌঁছানোয় আমরা কৃতজ্ঞ। এই দুই গ্রামের সব মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। গ্রামের সব কৃষকের জমি দেখার হাওরে। হাওর ডুবলে আমরা শেষ। শুধু আমরা না, এই হাওরে ৪টি উপজেলার কয়েক লক্ষাধিক কৃষকের জমি। এক ফসলি ধান দিয়ে সারা বছরের স্বপ্ন সাজান তারা। বেরিবাঁধে বেশি লুটপাটেরও অভিযোগ পাওয়া যায়। রাবার ড্যাম নির্মাণ হলে হাওরে আর বেরিবাঁধ দিতে হবে না। এতে লুটপাট বন্ধ হবে। হাওরের এই অংশে বিলুপ্ত হবে পিআইসি প্রথা।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার