ডুবছে ধান, যাচ্ছে প্রাণ

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ২৩:৪৫

সড়কে মরলে ৫ লাখ, হাওরে ২০ হাজার

বাবার জন্য কাঁদছে বজ্রপাতে নিহত কৃষক জমিরের ছেলে'-ছবি সুখবর

সোমবার বিকেল ঠিক সাড়ে ৪টা। জাতীয় সংসদে বজ্রপাতে মৃত্যু আতঙ্কের কথা তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংসদে দাবি উত্থাপন করেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। এমপি যখন সংসদে বক্তব্য রাখছেন তখন দেখার হাওরে ধান কাটার সময় সদর উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের স্লুইসগেটের কাছে বজ্রাঘাতে নিহত হন কৃষক জমির উদ্দিন সহ জেলার ৩ জন। চলতি বছরে এই ৩ জনসহ ৯ কৃষক ও ২ কিশোরের মৃত্যু হয়েছে বজ্রেরআঘাতে। আব্দুল্লাহপুরের এক সাংবাদিক জানালেন তার পরিবারের করুণ কাহিনী। শ্রমজীবী জমির ছিলেন একমাত্র উপার্জকারী। তার ঘামের বিনিময়ে পাওয়া পারিশ্রমিকে চলতো ছোট ছোট ২ ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীসহ ৫ জনের সংসার। 

 

 

 

নিহত জমির উদ্দিন

 

 


খবর পেয়ে সরেজমিনে নিহত জমিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বেহাল দশা তার ঘরের মাটির ঘরের। দুই রুমের একটি ঘর। ভেতরে মা, ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয় স্বজন এক খাটে বসা। মোবাইলে থাকা বাবার ছবি দেখাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে জমির উদ্দিনের বড় ছেলে। পাহাড়ের ঝর্ণার মতো জল ঝড়ছিল তার চোখ দিয়ে। ছবি দেখেই মনে পড়ে যায় বাবার আদর ভালোবাসার কথা। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল আর বলছিল, ‘আমার আব্বা আমারে জানের চেয়ে বেশি ভালাপাইতা,  আমরারে কোন কষ্ট দিতানা। অখন কুয়াই ফাইমু আমার আব্বারে।’

 


ছেলের এমন কান্না দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি নিহতের স্ত্রী আলেমা বেগম। কান্নার রোল পড়ে ঘরে। তিনি বলেন, আমার এই ঘর ছাড়া আর কিছুই নাই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধান আবাদের পর সেই ধান কাটতে দিয়ে চলে গেলেন আমার স্বামী। আমার বাবার বাড়িরও একই অবস্থা। পাড়া প্রতিবেশীর দয়া হলে তারা দিলে খাবো আর না দিলে না খেয়ে থাকতে হবে।  


নিহতের ভাই দিলাল উদ্দিন বলেন, ধান কাটার মেশিনের মানুষের সাথে কথা বলতে স্লুইসগেটের পাশে যায় আমার ভাই। যাওয়ার পথে বিজলী এসে পড়ে। পড়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে। আমার ভাই বিদায় নিলো তার জমির পাকা ধানও তলিয়ে গেলো। পরিবারটা ৩ সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে। এখন সরকারি সহায়তা পারে তাদের জীবিত রাখতে। 

 


প্রতিবছর জীবিকার টানে ধান কাটা ও মাছ ধরার সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে হাওরে মারা যান এমন অগণিত অসহায় হতদরিদ্র কৃষক, জেলে, মাঝি। সরকারি হিসেব বলছে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন ৬৩ জন। তবে তালিকায় থাকা এই হিসেব শুধুমাত্র যারা ২০ হাজার টাকা করে সহায়তার আওতায় এসেছেন তাদের। সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যায় আরও কয়েকগুণ নিহতের সংখ্যা। 
সদর উপজেলার ইসলামপুরের কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ভয় লাগলেও আমাদের হাওরে আসতেই হবে। হাওরে আমাদের রিজিক। কষ্ট কইরা ফসল ফলাইয়া যদি ঘরে তুলতে না পারি তাইলে বাচ্চা কাচ্চা উপোস থাকবে। যার জন্যে জানের মায়া ছেড়ে হাওরে আসতে হয়। 

 


গোয়াছরার মহরম আলী বলেন, দেখার হাওরে আমার জমি। বিশাল এই হাওরে যখন বজ্রপাত হয় তখন আমাদের যাওয়ার জায়গা থাকেনা। কেউ দৌড়ে আসতে পারলো আসে নাহলে হাওরেই মরে। আমাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র করতে হবে। যেন ঝড় তুফান আসলে আমরা আশ্রয় নিতে পারি।  

 


অথচ বজ্রপাত নিরোধের জন্য ২০২৩ সালে ৬ উপজেলায় কোটি টাকা ব্যায়ে স্থাপিত ১৮টি লাইটেনিং এরেস্টার ৩ বছরে নিরোধ করতে পারেনি একটি বজ্রপাত। তবে উপজেলা পিআইওর দেয়া তথ্যমতে একটি বাদে ১৭টি দন্ড সচল আছে দাবি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাসিবুল ইসলামের। 

 

সচেতন নাগরিক কমিটি সুনামগঞ্জের সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, হাওরে কৃষক ও জেলে যাবেই। এখানে তাদের জীবন জীবিকা। তাদের আটকে রাখা যাবে না। তাদের নিরাপত্তায় যে বজ্র নিরোধক দন্ডগুলো স্থাপন হয়েছিল তিন বছর হয় সেগুলোর কার্যকারিতা দেখা যায়নি। এই দন্ডগুলো লাগানোর স্থানও যথাযোগ্য হয়নি। কোনোটি বাজারে কোনোটি ইউনিয়ন পরিষদের ছাদে। এছাড়া তাল গাছ প্রজেক্টও সুনামগঞ্জে ফেল করেছে। যেটা কিছুটা কাজে এসেছে সেটা কৃষক ছাউনি। বোরো মৌসুমে কৃষক ছাড়াও ঝড় তুফান এলে বর্ষায় জেলেরা এটাতে আশ্রয় নিতে পারবে। 

 


তিনি আরও বলেন, একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যারা সড়কে দুর্ঘটনায় মারা যায় তারা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার। তাদের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় ৫ লক্ষ টাকা। অথচ হাওরের নেহাত গরিব অসহায় কৃষক বা জেলে, যার উপর নির্ভরশীল তার পুরো পরিবার। সেই মানুষ বজ্রপাতে মারা গেলে ক্ষতিপূরণ মাত্র ২৫ হাজার টাকা। সরকার বজ্রপাতে মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ সড়কে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের চেয়ে বেশি করতে হবে। বজ্র নিরোধের জন্য আরও বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা এবং প্রযুক্তির সাহায্য আগাম সতর্ক বার্তার ব্যবস্থা করতে পারে।  

 


জেলা প্রশাসক মো. মিনহাজুর রহমান বলেন, মন্ত্রণালয়ের সাথে সভা করার সময় হাওরে বজ্রপাতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আমি সহ অন্যান্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বজ্র নিরোধে আমাদের চাহিদা পাঠানোর জন্য। আমরা চাহিদাপত্র পাঠাবো। নতুন নীতিমালা হচ্ছে যেখানে বজ্রপাতে নিহতরা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার