হালির হাওরে জিরাতিদের স্বপ্নভঙ্গ

প্রকাশিত: ০২ মে, ২০২৬ ২২:২১

জামালগঞ্জে বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে কৃষকেরা বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। যতদূর চোখ যায়, শুধু ছিল সোনালি ধানের সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য ঘিরে বছরের সাত মাস মাঠে পড়ে থাকেন একদল কৃষক, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘জিরাতি’ বলা হয়। মূলত তারা কৃষিশ্রমিক। বোরো মৌসুমে হাওরের উঁচু জায়গায় ছোট ছোট কুঁড়েঘর ও টিনের ছাপড়া বানিয়ে সেখানে বসবাস করেন জিরাতিরা। আশপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গাছ বা ছায়া নেই। 

 

 

 


জামালগঞ্জের বেহেলি ইউনিয়নের হালির হাওরের রাইংগা নামক স্থানে মরা নদীর দুই পাশে কার্তিক মাস থেকে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে ছনের ঘর ও টিনের ছাপড়ায় বসবাস করেন বিভিন্ন এলাকার প্রায় শতাধিক জিরাতি। এই জিরাতিরা গবাদিপশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের ঝুঁকির মধ্যে কষ্ট করে বোনা ফসল ঘরে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করেন। হাওরের চারদিকে ধানক্ষেত, আর মাঝখানে চোখে পড়ে এসব ছোট ছোট কুঁড়েঘর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বছরের সাত মাস মাঠে পড়ে থাকেন শত শত কৃষক-কৃষাণী। তাদের নেই কোনো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন, এমনকি নেই ঘুমানোর মতো উপযুক্ত জায়গা। ছোট ছোট কুঁড়েঘরের ভেতরে মাচার উপর স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে ঘুমান তারা, আর মাচার নিচে রাখা হয় গবাদিপশু। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বসবাস করা এসব মানুষের ভাগ্যে জোটে না পুষ্টিকর খাবার। অধিকাংশ সময় মোটা চালের ভাত, পান্তা ভাত, মরিচ ভর্তা দিয়েই চলে তাদের খাবার। প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয় খোলা জায়গায়। রয়েছে শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা। 

 


কার্তিক মাসে তারা বাড়িঘর ছেড়ে হাওরে আসেন। জমি তৈরি, চারা রোপণ, ক্ষেত পরিচর্যা থেকে শুরু করে ধান কাটা ও মাড়াই শেষ করে নতুন ধান ও খড় নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ফসল ভালো হলে তাদের মুখে হাসি ফুটে, আর ভুলে যান সব দুঃখ-কষ্ট। আবার প্রস্তুতি নেন পরবর্তী মৌসুমের জন্য। এভাবেই যুগের পর যুগ জিরাতিদের জীবনচক্র চলে আসছে। কিন্তু এবার বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতায় তাদের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। হাওরের চারদিকে পানি জমে যাওয়ায় তিন ভাগের এক ভাগ ফসলও ঘরে তুলতে পারবেন না তারা। 
রাইংগায় বসবাসকারী জিরাতি মো. সেলিম মিয়া বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের এখানে ‘এরাইঙ্গা’ নামে কয়েকশ পরিবারের গ্রাম ছিল। শত বছর আগে হাওরের ঢেউয়ে গ্রামটি বিলীন হয়ে যায়। এরপর আমরা বিভিন্ন এলাকায় বসবাস শুরু করি। তবে এখানে এখনও আমাদের কয়েকশ একর জমি রয়েছে। তাই বছরের সাত মাস আমরা জিরাতি হিসেবে এখানে চাষাবাদ করি। কিন্তু এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিবৃষ্টির কারণে তিন ভাগের এক ভাগ ফসলও ঘরে তুলতে পারব না। যা কেটেছি, তাও শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট আল্লাহ ছাড়া কাউকে বোঝানো যাবে না। সরকার যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের গ্রামটি পুনরুদ্ধার করে দেয় এবং মরা নদীটি খনন করে, তাহলে খালের মাটি দিয়ে দুই পাশে বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

 

 


বেহেলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আমার ইউনিয়নের রাইংগা এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবার ছনের ঘর ও টিনের ছাপড়া তৈরি করে বছরের প্রায় সাত মাস জিরাতি হিসেবে ধান চাষ করেন। তারা কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মরা নদীটি খনন করা হলে এর মাটি দিয়ে তাদের বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং পাশাপাশি মাছের অভয়ারণ্যও সৃষ্টি হবে।

 


এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, চলতি বছর বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক তাদের ফসল কাটতে পারেননি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দ্রুত পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে খাল খনন প্রকল্পের আওতায় রাইংগার মরা নদী খননের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার