প্রকাশিত: ০৩ জুন, ২০২৬ ২৩:১১
মৎস্য ভান্ডার হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের। এরমধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলার আয়তন ৩৪০ বর্গকিলোমিটার। এই অঞ্চলের নদী, নালা ও ছোট-বড় বিল মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪২ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এছাড়াও এখানে প্রচুর শামুক ও ঝিনুক পাওয়া যায়, যা হাওরের প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। তবে নানাবিধ মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণে প্রতি বছরই হাওরে মাছের উৎপাদন কমছে।
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, স্থায়ী অভয়াশ্রম না থাকা, প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে পলি মাটি পড়ে ছোট-বড় বিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী, রিং জাল, কিরণমালা ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার মাছ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, সেচ দিয়ে বিলের তলা শুকিয়ে মাছ শিকার এবং জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাছের বংশবৃদ্ধি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে হাওরে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী ও বিল-বাদাড়ে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
এই হাওরগুলোর ওপর নির্ভর করে প্রতিবছর জীবিকা নির্বাহ করে হাজারো পরিবার। ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে জেলেরা দিন-রাত হাওরে মাছ ধরেন। কিন্তু দিন দিন মাছ কমে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
.jpg)
মৎস্যজীবীদের দাবি, মাছের বিলুপ্তি ঠেকাতে যে কোন মূল্যে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, অমৎস্যজীবীদের নামে জলমহাল ইজারা প্রথা বাতিল করা, পাম্প মেশিন দিয়ে বিল সেচে মাছ ধরা এবং জমিতে কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে অনেক প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরও কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, একসময় এই হাওরাঞ্চলে প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০টি প্রজাতি বিলুপ্তির তালিকায়। অবশ্য হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছে এবং জেলেদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার কমাতে চালানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) ও সচেতনতামূলক প্রচারণা।
উপজেলায় বর্তমানে ছোট-বড় ৩১৫টি পুকুর ও ৮২টি জলমহাল রয়েছে। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সংখ্যা ৫৬ টি। এখানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী ৯ হাজার ৫০০ জন এবং অনিবন্ধিত মৎস্যজীবী রয়েছেন ৬ হাজার ৪৮০ জন। উপজেলায় মাছের মোট চাহিদা ৩ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন হয় ৪২ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন।
গোপালপুর গ্রামের মৎস্যজীবী জয়কিশোর দাস বলেন, আমরা ৩০ বছর ধরে হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছি। দিন দিন মাছ কমে যাওয়ার মূল কারণ ত্রুটিপূর্ণ ইজারা প্রথা। যারা ইজারা নেয়, তারা প্রকৃত মৎস্যজীবী নয়। অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তারা নামে-বেনামে মৎস্যজীবী সংগঠন তৈরি করে। আবার কেউ কেউ প্রকৃত মৎস্যজীবী সমিতিকে অর্থের বিনিময়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইজারা নেয়। বেশি মুনাফার আশায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তারা বিলের তলা শুকিয়ে, বিষাক্ত ওষুধ (মেডিসিন) দিয়ে মাছের প্রজনন ধ্বংস করছে।
তিনি আরও জানান, হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে বিল ও মরা নদীগুলো খনন করতে হবে। পাশাপাশি বৈশাখ থেকে আষাঢ়- এই তিন মাস সরকারিভাবে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। প্রকৃত জেলেদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ দিলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও মাছ রপ্তানি করা সম্ভব।
বিষ্ণুপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মনিলাল সরকার বলেন, প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে মৎস্যজীবী সমিতির নাম ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জলমহালের সুবিধা ভোগ করছে। অর্থ ও শক্তির জোরে তারা জলমহালের মালিক বনে যাওয়ায় প্রকৃত জেলেরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারের উচিত এই অনিয়ম এবং হাওরে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করা। তাহলেই হাওর আবার মাছে ভরে উঠবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম বলেন, পাহাড়ি ঢলে নদী-নালা ও খাল-বিল ভরাট হওয়া, পরিবেশ দূষণ, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণে মাছের উৎপাদন কমছে। আমরা কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। বিল সেচে যেন মাছ ধরা না হয়, সেজন্য প্রচারণা চলছে। প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য আইন বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, ভরাট হওয়া জলাশয় খনন ও স্থায়ী মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। জলমহালগুলো যেন প্রকৃত জেলেরা পায়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে এবং মৎস্য বিভাগ হাওরের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন