প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬ ২২:৪৪
তিন বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধে সরকার প্রায় ৫ লাখ ৯ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব ভ্যাকসিন নামমাত্র মূল্যে গরুর মালিকদের কাছে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু হাওরাঞ্চলে এই জেলার গ্রামাঞ্চলে ভিন্ন চিত্র।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক গরুর মালিক কখনোই এসব ভ্যাকসিন পান নি। ফলে তড়কা, বাদলা, গলাফোলা, খুরা ও স্কিন ডিজিজসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি এই বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন গেল কোথায়?
.jpg)
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। ধান উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি পরিবারই গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল। একটি গরু এখানে শুধু প্রাণী নয়, বরং পরিবারের সঞ্চয়, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রতীক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। অথচ রোগ প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের বাস্তবতা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, গেল তিন বছরে জেলায় মোট ৫ লাখ ৯ হাজার ৬৫ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের ভ্যাকসিন এসেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ ডোজ, যার সরকারি মূল্য প্রতিটি ১ টাকা ২৫ পয়সা। বাদলা রোগের ভ্যাকসিন এসেছে ৮৮ হাজার ৩৪০ ডোজ, মূল্য ২ টাকা। গলাফোলা রোগের জন্য এসেছে ৮৫ হাজার ডোজ, প্রতিটির মূল্য ১ টাকা। বসন্ত রোগের ভ্যাকসিন এসেছে ৪৮ হাজার ডোজ, মূল্য ১ টাকা ৩৩ পয়সা। খুরা রোগের ভ্যাকসিন এসেছে ৪ হাজার ৪০০ ডোজ, মূল্য ২৫ টাকা। আর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) প্রতিরোধে এসেছে ৭ হাজার ৮২৫ ডোজ, প্রতিটির সরকারি মূল্য ৫০ টাকা।
কাগজে—কলমে এসব ভ্যাকসিন সরবরাহ ও বিতরণের হিসাব থাকলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছেন গরুর মালিকরা।
.jpg)
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল আজাদ বলেন, আমাদের গ্রামে কোনো সময় প্রাণিসম্পদ অফিসের কেউ আসে নি। ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা তো দূরের বিষয়। রোগ হলে স্থানীয় চিকিৎসক ডেকে চিকিৎসা করাতে হয়। এসব রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আছে, সেটাও আমরা জানতাম না।
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের খলিশাজুরী গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাবউদ্দিন জানান, গত পৌষ মাসে তার দুটি গরু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তিনি বলেন, সরকারি ডাক্তারকে ফোন করেছিলাম। তারা বললেন দূরে হওয়ায় খরচ বেশি হবে। পরে স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু গরু বাঁচে নি।
একই গ্রামের ওয়ারিশ আলীর অভিযোগ, তার চারটি গরুর শরীরে চাকা চাকা ফোলা ও পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। পল্লি চিকিৎসক ডাকলেই ওষুধ—ফি মিলিয়ে অনেক টাকা লাগে। আজ প্রথম শুনলাম এসব রোগের ভ্যাকসিন আছে। যদি নিয়মিত দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এমন অবস্থা হতো না বলেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ভ্যাকসিনের তথ্য ও সেবা হাওরাঞ্চলের বহু মানুষের কাছেই পৌঁছায় না। ফলে অসুস্থ পশুর চিকিৎসায় তাদের নির্ভর করতে হয় অননুমোদিত পল্লি চিকিৎসকদের ওপর। এতে ব্যয় বাড়ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় গবাদিপশু মারা যাচ্ছে।
.jpg)
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গবাদিপশুর ছয় ধরনের ভ্যাকসিন আমরা নিয়মিত পাই এবং চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ ভ্যাকসিন সরবরাহ হয়েছে। সব ভ্যাকসিনই মাঠপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেছেন, আবার বিশেষ ক্যাম্পেইন করেও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা বলেছেন তারা ভ্যাকসিন পাননি, তারা হয়তো সচেতন নন। গরু পালন করলে ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জানতে হবে। মাঠকর্মীরা সচেতন মালিকের গরুকে ভ্যাকসিন দিয়েছেন।
তবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় অনেকেই। তাদের প্রশ্ন, যদি ভ্যাকসিন নিয়মিত বিতরণ হয়েথাকে, তাহলে গরুর মালিকরা কেন তা জানেন না? কেন দুর্গম হাওর এলাকায় সরকারি সেবার উপস্থিতি দেখা যায় না? আর কেন এখনো পল্লি চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে সাধারণ গরুর মালিকদের?
.jpg)
হাওরাঞ্চলের গরুর মালিকদের দাবি, ভ্যাকসিন বিতরণের সঠিক তালিকা প্রকাশ, ইউনিয়ন ভিত্তিক ক্যাম্পেইনের তথ্য জানানো এবং মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক। কারণ একটি গরুর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়, বরং একটি পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও বটে।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আবু জাফর মো. ফেরদৌস বলেন, সরকারিভাবে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। চাহিদা অনুযায়ী আমরা ভ্যাকসিন পাই না। এ কারণে বেসরকারি উদ্যোগে ভ্যাকসিন আমদানি ও সরবরাহের বিষয়েও আমরা উৎসাহ দিয়ে থাকি।
তিনি আরও বলেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরও কিছু ক্ষেত্রে গবাদিপশু মারা যেতে পারে। কারণ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভিন্ন কারণে কমে যেতে পারে। তবে গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় নি, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন