প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ২৩:০০
জেলায় ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত একমাস ব্যাপী হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জেলার প্রায় সকল মৎস্যজীবী এখনো মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। তারা বলছেন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কিংবা সরকারি প্রণোদনা না থাকায় প্রশাসনের জারিকৃত এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি মানা সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে।
এদিকে দ্রুত বেড়ে উঠার সময় মাছ ধরায় বছরের অন্য মৌসুমে ‘মাছের দেশেই মাছের আকাল’ দেখা দেয় বলে মত দিয়েছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা। জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, ছেফটির হাওর, দেখার হাওর, পাখিমারা হাওর সহ ছোট বড় ১৩৭টি হাওরে লক্ষাধিক মানুষ মৎস্যজীবী হিসেবে প্রতিদিন মাছ ধরে থাকেন। সরকারি হিসাব বলছে, জেলায় ১ লক্ষা ১২ হাজার তালিকাভুক্ত জেলে মাছ ধরার সাথে যুক্ত আছেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তালিকার চেয়ে দ্বিগুণ আছেন তালিকার বাইরে।
.jpg)
জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে মাছ ধরা বন্ধে ৩৭টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জেলার মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়, বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব অভিযান বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অভিযানগুলোতে ১২ জন জেলেকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে ২৫৭টি চায়না দুয়ারি জালসহ বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য জাল ও প্লাস্টিক ছাই।
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানিয়েছেন, হাওরে পানি থাকবে আর এক মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকবে— সরকারের এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হবে না, যতক্ষণ না কার্যকরি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কার্যকরি উদ্যোগ কি হতে পারে জানতে চাইলে মাছ ধরা, বিক্রি ও বাজারজাত করণের সাথে সম্পৃক্ত এমন একাধিক জেলে জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি পেশা নয়। এখানে জড়িত আছে জেলেদের জীবিকা। সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের ভরণ—পোষণ চিকিৎসাসহ সব। তাই, মাইকিং করে, অভিযান চালিয়ে, জেল—জরিমানা আর জাল—ছাই পুড়িয়ে কিংবা শুধু শুধু বুলি আওড়ালেও হবে না। যদিও এটি মৎস্য সংক্রান্ত সকলের উপকারের জন্য নেওয়া একটি পদক্ষেপ তবু এখানে বাস্তবমুখী আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন— জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা, প্রণোদনা দেওয়া ও পরবর্তীতে জলাশয়—নদী উন্মুক্ত রাখা। এই কার্যকর পদক্ষেপগুলো নিলে জেলেরা কিছু দিন হলেও মাছ ধরা বন্ধ রাখবেন। না হলে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
.jpg)
চল্লিশোর্ধ একজন জেলের নাম আবদুল হক। বুঝে উঠার পর থেকেই তিনি টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরেন। তিনি বলেন, আমার সাত জনের সংসার। ছেলেকে মাছ ধরতে আনি না। সে ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি চাই সে আমার পেশায় না আসুক। ঘরে বড় মেয়ে আছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। সব মিলিয়ে সংসারের বোঝা ভারী। এখন সরকার বলছে এক মাস মাছ না ধরতে। আমি খাবো কী? আমার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, সংসারের অন্যান্য খরচ কীভাবে চলবে। ক্ষুদ্র এক জেলে আমি। ঘরে বসে খাওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। প্রয়োজনীয় চাল, কিছু নগদ টাকা দিয়ে যদি সরকার বলতো একমাস মাছ ধইরেন না, তখন মানা যেতো। না হলে আমাকে অন্য কোনো কাজ দিক।
তার কথার সাথে সুর মিলান দেখার হাওরের জেলে আলীম উদ্দিন ও সোহেল মিয়া। আলীম উদ্দিন বংশ পরম্পরায় জেলে হলেও সোহেলের মূল পেশা কৃষক। বর্ষা মৌসুম এলে তার পেশা হয় মাছ ধরা। তাদের বা তাদের মতো মানুষদের বেঁচে থাকার এখন প্রধান অনুষঙ্গই মাছ ধরা। তাঁদেরও দাবি, এভাবে শুধু ঘোষণা দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা যাবে না। দরকার সরকারি প্রণোদনা অথবা বিকল্প কর্মসংস্থান।
এ বিষয়ে কথা হয়েছে মৎস্য বিশেষজ্ঞ একাধিক সরকারি কর্মকর্তার সাথে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারাও জানিয়েছেন, আইন করে মাছ ধরা বন্ধ করা খুবই কঠিন; প্রায় অসম্ভব। বেশিরভাগ জেলেরা এই নিষেধাজ্ঞা মানবেন না। কারণ তাদের প্রধান জীবিকাই এটি। মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হলে সরকারকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতেই হবে।
এ বিষয়ে কথা হয় সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল মিনান নূরের সাথে। তিনি বলেন, এটা সত্য যে দীর্ঘ এক মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখা জেলেদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমরা যে কাজটি করতে চাইছি এটি কিন্তু জেলেদের লাভের জন্য করা হচ্ছে। এখন হাওরে মাছের বেড়ে উঠার সময়, তুলনামূলক পানি কম, মাছ সেরকম করে ছোটাছুটি করতে পারছে না। মাছ বড় হলে খেতে স্বাদ ও দাম পাওয়া যাবে। বেশি মাছ পাওয়া যাবে— তাই আমরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রণোদনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলেদের এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। আমরা এ বিষয়ে অবগত আছি। উর্ধ্বতনদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি অবগত করেছি। এ বছর কিছু না হলেও আগামী বছর কিছু একটা হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। আর মাছ ধরা বন্ধের অভিযান এই মাসে অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন