‘আঁচড়া’ পচা ধান তুলছেন কৃষকরা

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ২৩:০৬

অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরে তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর সারা বছরের একমাত্র খোরাকি এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জেলার লক্ষাধিক কৃষক এখন চরম ক্ষতিগ্রস্ত। তবে এই চরম দুর্দিনেও হাত গুটিয়ে বসে নেই তারা। জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে শত শত নৌকায় করে কৃষকরা ‘আঁচড়া’ (পানি থেকে ধান সংগ্রহ করার বিশেষ যন্ত্র) দিয়ে তলিয়ে যাওয়া পচা ধান সংগ্রহের যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

 


দীর্ঘদিন পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ধানগুলোতে পচন ধরেছে। এমনকি অনেক ধানের শীষেই ইতোমধ্যে চারা গজিয়ে গেছে। এরপরও জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন প্রতি নৌকায় চার—পাঁচজন মিলে হাওরের পচা ধান টেনে তুলছেন। এই ধান শুকিয়ে চাল বের করে কেউ কম দামে বিক্রি করছেন, আবার কেউ গবাদিপশু ও হাঁস—মুরগির খাদ্য হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

 

 

 

 


সরেজমিনে সদর উপজেলার দেখার হাওর এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরে গিয়ে কৃষকদের এই ধান তোলার নির্মম চিত্র দেখা গেছে। কৃষকরা জানান, পচা ধান সংগ্রহ করে শুকিয়ে এবং ঝেড়ে পরিষ্কার করা হলেও চালের ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ পুরোপুরি যাচ্ছে না। তবুও বেঁচে থাকার তাগিদে একেকটি পরিবার ইতোমধ্যে ২০ থেকে ২৫ মণ পর্যন্ত পচা ধান সংগ্রহ করেছে।

 


এদিকে হাওরডুবিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সরকারি তথ্য এবং কৃষকদের দাবির মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর। এরমধ্যে ২ লক্ষ ৬ হাজার ৭২৫ হেক্টর বোরো ফসল কাটা হয়েছে এবং জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ হাজার হেক্টর। কিন্তু কৃষকদের দাবি জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক হাওরডুবিতে প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

 

 

 

 


মদনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিস ২৫ কেয়ার (আট একর ৩০ শতাংশ) জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৮ কেয়ার (দুই একর ৬০ শতাংশ) জমির ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি ১৭ কেয়ার (৫ একর ৬০ শতাংশ) জমি পানির নিচে। ছয় ছেলে—মেয়েসহ আট সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি অনাহারে দিন গুনছিলেন। তিনি বলেন, গত ১৫ দিন ধরে ছেলেদের নিয়ে সকালে হাওরে যাই। ‘আঁচড়া’ (পানি থেকে ধান সংগ্রহ করার যন্ত্র) দিয়ে ধান তুলি। রোদ থাকলে সুবিধা, কিন্তু মেঘ—বৃষ্টি দেখলেই আতঙ্কে বুক কাঁপে। দিনে দুইবার নৌকা বোঝাই করে ধান আনি। এ পর্যন্ত ৩০ মণ তুলেছি। ধানে গন্ধ থাকে, চালে পাথর পাওয়া যায়, তাও কোনো রকমে খেয়ে—না খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই কষ্ট করছি। সরকার কৃষকদের সাহায্য করছে শুনছি, কিন্তু আমরা কিছু পাই নি।

 


তিনি বলেন, দিনে দুইবার নৌকা বোঝাই করে ধান এনে বাড়ির পাশের সড়কে জমা করে রাখি। পরিবারের মহিলাসহ অন্যরা এই এগুলো থেকে ঝেড়ে খড় এবং ধান পৃথক ভাবে শুকিয়ে বস্তায় করে বাড়িতে নেন। এই ধান মেশিনে ভাঙ্গানোর পর চাউলগুলো খাচ্ছি। তিনি বলেন, ধানে কিছুটা গন্ধ থাকে এবং চাউলে পাথরও পাওয়া যায়। 

 


গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষাণী আইমনা বেগম সড়কের পাশে পচা ধান ও খড় শুকানোর কাজ করছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার স্বামী আর চার ছেলে মিলে হাওর থেকে দিনে দুই মণ করে ধান তুলছে। আমরা নারীরা তা ঝেড়ে শুকাচ্ছি। অনেক কষ্ট হচ্ছে। ঋণ করে ক্ষেত করছিলাম, সব পানিতে নিছেগি। সরকার আমরারে কিছুই দিছে না। নাম নিছে কিন্তু কিছু পাইছি না।

 


একই গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ২০ কেয়ার জমির মধ্যে ১২ কেয়ার হারিয়েছেন। চাষাবাদে খরচ হয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু তালিকায় আমার নাম নেই। আমাদের এলাকার গাড়ি চালক—যাদের কোনো জমিজমা নাই, তারা সহায়তা পায়, অথচ আমরা প্রকৃত কৃষকরা পাই না।

 


তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বাচ্চা—কাচ্চা লইয়া চলমু কিভাবে। এজন্য কষ্ট করে নিজের পচা ধান তুলছি। এ পর্যন্ত পনেরো দিনে দুই ভাই মিলে ২০—২৫ মণ ধান সংগ্রহ করেছি, যতদিন পারা যায়, তুলমু। 
সাধারণত বৈশাখ মাস এলে হাওরাঞ্চলে ধান কাটার একটা উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু পচা ধান তোলায় কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল হাহাকার, হাড়ভাঙা খাটুনি আর ক্ষোভ—অনুযোগ। গুলেরগাঁও গ্রামের সাদিকুর রহমান জানান, গত ১৫ দিনে ২০—২২ মণ পচা ধান তুললেও মেঘ—বৃষ্টির ভয়ে প্রতিটা মুহূর্ত আতঙ্কে কাটে তাদের। তিনি আরও বলেন, আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ঋণ করে করা জমির অর্ধেক ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। 

 


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে জলাবদ্ধতার পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান এখনও কৃষকরা তুলছেন এবং সড়কে শুকাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পানিতে থাকায় এই ধানগুলোর রঙ কালো হয়ে গেছে এবং পচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। আমরা সরেজমিনে কৃষকদের সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, এই ধানগুলো তারা নিজেদের খাবার এবং গবাদিপশু ও হাঁস—মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করবেন।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার