প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬ ২১:৩৯
তাহিরপুর সীমান্ত এলাকার ১৭টি পাহাড়ি ছড়া দীর্ঘদিন ধরে বালুতে ভরাট হয়ে থাকায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি স্বাভাবিকভাবে হাওরে প্রবাহিত হতে না পেরে বসতঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে এবারের পাহাড়ি ঢলে সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার সীমান্তবর্তী চাঁনপুর ছড়া, রজনী লাইনছড়া, বড়ছড়া, ট্যাকেরঘাট ছড়া, লাকমাছড়া, লালঘাটছড়া, বাঁশতলাছড়া, চারাগাঁও ছড়া, কলাগাঁও ছড়া, জঙ্গলবাড়ী ছড়া, লামাকাটা ছড়া, বাগলি ছড়াসহ ছোট—বড় ১৭টি পাহাড়ি ছড়া দীর্ঘদিন খনন না করায় বালুতে ভরাট হয়ে পড়েছে। একারণে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই ঢলের পানি ছড়া দিয়ে হাওরে না গিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালু জমে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে শনিবার ৩৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর প্রভাবে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবল ঢল নেমে আসে। এতে সুরমা নদীর পানি শনিবার সকাল ৯টা থেকে রবিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৮৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। তবে সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত না থাকায় নদ—নদীর পানি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
তাহিরপুর সীমান্তের লাউড়েরগড় থেকে বাগলিছড়া পর্যন্ত সীমান্তজুড়ে ১৭টি পাহাড়ি ছড়া দিয়ে ঢলের পানি নেমে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে চারাগাঁও ছড়া ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঢলের পানি বাঁশতলা, চারাগাঁও, মাঝহাটি, জঙ্গলবাড়ী, সংসারপাড়া, কলাগাঁও, বাজারহাটি ও লালঘাট গ্রামের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। চারাগাঁও কয়লা ডিপোর বিপুল পরিমাণ কয়লা ভেসে গেছে এবং বহু পাথরের স্তুপ বালুর নিচে চাপা পড়েছে। বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার বেশ কয়েকটি পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। প্রবল ঢলে স্রোতে হাওরবাংলা টেকনিক্যাল স্কুলের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারাগাঁও বাজারের মুদি দোকানি বাবুল মিয়ার প্রায় ২ লাখ টাকার মালামাল ভেসে গেছে। একই গ্রামের তরুন হেলাল আহমেদ ও আফজাল হোসেনের দুইটি পুকুরের প্রায় তিন লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। চারাগাঁও উত্তর হাটি গ্রামের নাজিম উদ্দীনের বসতঘর ভেঙে এবং লাখ টাকার কুড়ানো বাংলা কয়লাও ভেসে গেছে।
চারাগাঁও শুল্ক স্টেশনের সিনিয়র সহ—সভাপতি সামসুল হক মেম্বার বলেন, হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাজার, বাঁশতলা ও শুল্ক স্টেশন এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ছড়াগুলো বালুতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঢলের পানি ছড়িয়ে পড়ে বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। তিনি বলেন, দ্রুত ছড়াগুলো খনন না করলে আরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস ছামাদ মুন্সী বলেন, আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সাত থেকে আটটি গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেই গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে রাস্তাঘাট গুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এদিকে ঢলের পানিতে তাহিরপুর—সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ারকলা এলাকার ডুবন্ত সড়ক প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের কারণে সাময়িকভাবে সড়ক যোগাযোগও ব্যাহত হয়। যাদুকাটা, মাহারাম, রক্তি ও পাটলাই নদী দিয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অন্তত ৫০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রাজধরপুর, রামজীবনপুর, সাহেবনগর, পৈন্দুপ, গোপালপুর, মারালা, নোয়ানগর, নোয়াগাঁও, ইক্রামপুর, জগদীশপুর, সাহসপুর, সুলেমানপুর, উমেদপুর, আনন্দনগর, পাটাবুকা, ভবানীপুর ও দুমালসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম। এছাড়া উত্তর শ্রীপুর, দক্ষিণ বড়দল ও বাদাঘাট ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রামও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বলেন, ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ঢলের পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যাদুকাটা ও মাহারাম নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী থেকে বালু—পাথর উত্তোলনকারী প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চারাগাঁও শুল্ক স্টেশনের শতাধিক কয়লা ডিপো প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ১০ হাজার কয়লা শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, তাহিরপুর—সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুর—শক্তিয়ারকলা অংশ পানির নিচে চলে গিয়েছিল। তবে সোমবার সকাল থেকে পানি নেমে যাওয়ায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। চারাগাঁও এবং কলাগাঁও সীমান্ত এলাকার অনেক পরিবার পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী তিন দিন এ ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে এবং নদ—নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বড় ধরনের বন্যার পূর্বাভাস নেই। বৃষ্টিপাত কমলে পানিও কমতে শুরু করবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, পাহাড়ি ঢলে চারাগাঁও ও কলাগাঁও সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন