প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৬ ২৩:১৭
শান্তিগঞ্জে চল্লিশ দিনে ৬ মামলা, গ্রেপ্তার ৭
একসময় মাদকবিরোধী অভিযান বলতে স্থানীয়দের চোখে ভেসে উঠত পুলিশের বিশেষ অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম। কিন্তু শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে এখন ভিন্ন এক চিত্র লক্ষণীয়। সেখানে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছেন গ্রামের তরুণরা। নিজেদের গ্রামকে মাদকমুক্ত রাখার প্রত্যয়ে তারা দিন রাত পাহারা দিচ্ছেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন, প্রয়োজন হলে তল্লাশি চালিয়ে মাদকসহ আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ থেকেই যুব সমাজের এই সংগঠিত উদ্যোগের জন্ম। তাদের বিশ্বাস, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না তুললে শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
এর সর্বশেষ উদাহরণ গত বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে কান্দিগাঁও গ্রামের সামনে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন রুবেল মিয়া। স্থানীয় যুবকেরা তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি চালান। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি মদের বোতল, প্রায় ২০০ গ্রাম গাঁজা ও চারটি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। পরে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জব্দ হওয়া মাদকসহ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়ন রুবেল মিয়াকে। রুবেল একই ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া বড়বাড়ি গ্রামের নুরুজ্জামালের ছেলে।
তবে এটি একদিনের ঘটনা নয়। স্থানীয়রা জানান, গত প্রায় ১০ দিন ধরে কান্দিগাঁও গ্রামের যুবকেরা নিয়মিত পাহারা, বৈঠক এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গ্রামের ভেতরে কিংবা আশপাশে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি দেখা গেলেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রয়োজন মনে হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউনিয়নের শত্রুমর্দন বাঘেরকোনা গ্রামেও। সেখানে স্থানীয় যুবকেরা ইয়াবাসহ এক মাদক বিক্রেতা ও এক সেবনকারীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। বাঘেরকোনা গ্রামের তরুণদের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীদের অবাধ চলাচল বন্ধ করতে তারা নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।
এরও আগে নবীনগর গ্রাম সহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক সংগঠন এফডিআর—এর সদস্যরা একাধিক মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন। তারা শুধু মাদক উদ্ধার কিংবা অভিযুক্তদের পুলিশে সোপর্দ করেই থেমে থাকেননি; বরং পরিচিত মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গিয়ে এই পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন।
মাদকবিরোধী এই আন্দোলন এখন আর কয়েকটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিমপাড়া, হোসেনপুর, ব্রাহ্মণগাঁওসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার তরুণরা সভা—সমাবেশ করে মাদক নির্মূলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। হোসেনপুর পয়েন্টে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনোভাবেই মাদক ব্যবসায়ী বা সেবনকারীদের সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
সামাজ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। কারণ, মাদক ব্যবসায়ীরা বাইরের কেউ নন; অনেক সময় তারা স্থানীয় পরিবেশের সুযোগ নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করেন। ফলে গ্রামের মানুষ সচেতন হলে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে সতর্কতাও রয়েছে। এলাকার প্রবীণ ও সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন যেন কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়।
স্থানীয় জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা বলেন, যুবকেরা যে কাজটি শুরু করেছে, সেটি আরও আগে আমাদের করা উচিত ছিল। আমরা তাদের পাশে আছি। তবে কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। মাদক কারবারিরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একটি ভুল পুরো আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। তাই পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, যুবকেরা অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শামছুল হক বলেন, মাদক সমাজকে ধ্বংস করছে। পরিবার ভাঙছে, অপরাধ বাড়ছে। তাই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে যুবকদের দায়িত্ব হবে তথ্য সংগ্রহ করে প্রশাসনের কাছে দেওয়া। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। জনগণ ও প্রশাসনের সমন্বয়েই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে কোনো অবস্থাতেই আইন হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি অলি উল্লাহও যুবকদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণের সহযোগিতা থাকলে মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ দমন সহজ হয়।
উল্লেখ্য, স্থানীয়দের অংশগ্রহণের প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। শান্তিগঞ্জ থানার তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চারটি মামলা হয়েছে এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চলতি জুলাই মাসের শুরুতেই দুটি মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, এই তিনজনকেই স্থানীয় যুবকেরা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন