কয়লা কুড়িয়ে জীবিকা

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৬ ২৩:০১

জেলার হাওর অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম তাহিরপুর। ধান উৎপাদনের বাম্পার হাউস হিসেবে পরিচিত এই উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাংশের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি আজও। ঢলের পানিতে আর বন্দরের পথে পথে কুড়ানো কয়লা বিক্রি করে চলছে তাদের জীবন।

 


বর্তমানে উপজেলার সীমান্তের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ কুড়ানো কয়লায় (বাংলা কয়লা) জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও আগাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসছে। গত কয়েকদিনের দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদী যাদুকাটা, মাহারাম, বৌলাই, রক্তি ও পাটলাইয়ে প্রবাহিত হচ্ছে প্রবল স্রোত। এতে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৫০টিরও বেশি গ্রাম প্লাাবিত হয়েছে। এ পানির সঙ্গে সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি কয়লা।

 


স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের কলাগাঁও ছড়া—সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢলের পানির সঙ্গে ভেসে আসছে থরে থরে কয়লা। বৃষ্টি, স্রোত উপেক্ষা করে সীমান্ত ঘেঁষা জনপদের শতাধিক বাসিন্দা সে কয়লা কুড়াতে নেমে পড়েছেন পানিতে। ঠেলা জাল দিয়ে কয়লা আহরণ করছেন তারা। সেই কয়লা তীরে থাকা সাহায্যকারীরা বস্তায় ভরছেন। পরে সনাতনী প্রক্রিয়ায় এসব কয়লা থেকে নুড়ি ও বালু ঝেড়ে তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়।
উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস যাদুকাটা নদীসহ সীমান্তবর্তী ২০টি পাহাড়ি ছড়া থেকে কুড়ানো কয়লা। বছরের অন্য সময়ে বন্দরের সড়কে ট্রলি, ট্রাক থেকে পড়া কয়লা কুড়িয়ে বিক্রি করেন তারা।

 


ছড়া থেকে কয়লা নিয়ে উঠে আসা চারাগাঁও গ্রামের নারী কয়লা সংগ্রাহক জড়িনা খাতুন (৫০) বলেন, ভারী বর্ষণে চারাগাঁও ছড়া দিয়ে ঢলের পানি নামে। তার সঙ্গে বালু মিশ্রিত কয়লা ভেসে আসে মেঘালয় পাহাড় থেকে। তারা ঠেলাজাল দিয়ে স্রোতের বিপরীতে সেই কয়লা সংগ্রহ করেন। সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১০ বস্তা কয়লা সংগ্রহ করা যায় এক বেলায়। এ কয়লা থেকে বালু ও নুড়ি ঝেড়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বস্তা প্রতি ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারেন। এ ছাড়া বন্দরের পথে পরিবহন থেকে খসে পড়া কয়লাও কুড়িয়ে এনে বিক্রি করেন তারা। স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে অবশ্যই তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যাবেন। বিশেষ করে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে তারা স্থায়ীভাবে উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানে আগ্রহী। 
স্থানীয় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানান, প্রতিবছর বর্ষায় ভারত থেকে নেমে আসা যাদুকাটা নদী ও সীমান্ত ছড়াগুলো দিয়ে বালুর সঙ্গে মিশে থাকা কয়লা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। মেঘালয় পাহাড়ে যে কয়লা উত্তোলন করা হয়, তার একাংশ পাহাড়ি ঢলের স্রোতের সঙ্গে নুড়ি ও বালু মিশ্রিত কয়লা হিসেবে ভেসে আসে এই অঞ্চলে।

 


তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি খসরুল আলম বলেন, সীমান্ত এলাকার ছড়াগুলোতে নারী শ্রমিকরা অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই কয়লা কুড়িয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। সরকার কর্তৃক এসব শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তিনি আরও জানান, এ বছর গত ২১ জুন আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে চারাগাঁও ডাম্পের তার নিজের ১০০ মেট্রিক টন কয়লা পানির তোড়ে ভেসে যায়। এতে ১৬ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান।
স্থানীয় সচেতন মহলের একাধিক সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই গোষ্ঠীটির কয়লা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহের প্রবণতা দেখে বোঝা যাচ্ছে তাদের নতুন প্রজন্মও একই পথে চলছে। জীবিকার স্থায়ী বন্দোবস্ত না থাকায় এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন তারা। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন এরা। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা না থাকায় এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের চোরাই কয়লা সংগ্রহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে।

 


চারাগাঁও স্থল শুল্ক স্টেশনের কয়লা আমদানিকারক শামছুল হক বলেন, প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের ে¯্রাতে ভেসে আসা কয়লা সংগ্রহ করেন হাজারো নারী—পুরুষ। এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। আবার শুষ্ক মৌসুমে রাস্তায় পড়ে থাকা কয়লা কুড়িয়ে পরিবারের চাহিদা মেটান। এসব কয়লা প্রতি বস্তা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করে তারা। প্রায় ৫০ বছর ধরে ছড়া থেকে কয়লা তুলে এভাবে তারা বিক্রি করে আসছেন। গত ৫ বছর ধরে শ্রমিকদের কুড়ানো কয়লা অবাধে বিক্রির সুযোগ কম। তাদের এই কয়লা অবাধে বিক্রি এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।
চারাগাঁও গ্রামের কয়লা আমদানিকারক সাদ্দাম হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলের সাথে ভেসে আসা দরিদ্রদের কুড়ানো কয়লা বিক্রি করতেও স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের অনুমতি লাগে। কুড়ানো কয়লা (বাংলা কয়লা) যদি তারা অবাধে বিক্রি করতে পারতো তাহলে তারা অনেকটাই লাভবান হতো।

 


তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, যাদুকাটা নদী ও সীমান্তের ২০টি পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু মিশ্রিত কয়লা সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে এই গোষ্ঠীটি। অন্য কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। উপজেলার শ্রমজীবী লোকজন নদীর স্রোতের সঙ্গে নিজেদের জীবনধারা পরিবর্তনে চেষ্টা চালাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে তাদের ভাগ্যোন্নয়নে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার